বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের (বিপিএল) চলতি আসরে দুর্নীতির অভিযোগে এক ক্রিকেটারসহ চারজনকে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তাদের মধ্যে একজনকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গতকাল মিরপুরে বিসিবি’র কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যাড-হক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন। দুর্নীতি দমন বিধিমালার বিভিন্ন ধারা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত এই চারজন হলেন ক্রিকেটার অমিত মজুমদার, চট্টগ্রাম রয়্যালসের লজিস্টিকস ম্যানেজার লাবলুর রহমান, সিলেট টাইটান্সের ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিক এবং নোয়াখালী এক্সপ্রেস দলের অংশীদার তৌহিদুল হক তৌহিদ। বিসিবি ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের তদন্তের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে জুয়া, তদন্তে অসহযোগিতা ও দুর্নীতিমূলক আচরণের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের আগামী চৌদ্দ দিনের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই দিন বিপিএল নিয়ে বোর্ডের কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে সভাপতি বলেন, ‘সঠিক ও যোগ্য ফ্র্যাঞ্চাইজি না পেলে আগামীতে জোড়াতালির কোনো আসর আর মাঠে গড়াবে ঘন।’ ‘মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক এবং অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতার কারণে দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে’ বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর গাফিলতির কারণে বোর্ডের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিকেও তিনি ‘বড় ধরনের অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিসিবি সভাপতি।
অন্যদিকে শাস্তির বিষয়ে বিসিবির একটি সূত্র জানায়, ‘বিপিএলের ১১ তম আসরে যে ৯ ক্রিকেটারকে নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল তা চলমান রয়েছে। এবার যাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাদের মধ্যে সামিনুর আজীবন নিষিদ্ধ। আর বাকি চারজনকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’ ক্রিকেটার অমিত জাতীয় দলে না খেললেও ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত মুখ। বাজিকরদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সরাসরি বাজিতে অংশ নেয়ার মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন তিনি। অন্যদিকে লাবলুর এবং তৌহিদুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও মারাত্মক। তারা শুধু দুর্নীতিতেই জড়াননি, বরং দুর্নীতি দমন কর্মকর্তার কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন। প্রাসঙ্গিক তথ্য গোপন ও মুছে ফেলার মাধ্যমে তারা তদন্তকে বিপথে নেওয়ার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চালান। অমিতের মতোই জুয়ায় সরাসরি যুক্ত থাকায় বোর্ডের কাঠগড়ায় উঠেছেন রেজওয়ান। পাশাপাশি স্পট ফিক্সিং ও একাধিক দুর্নীতিতে জড়িত থাকার দায়ে সামিনুর রহমানকে বোর্ডের বিশেষ পলিসির আওতায় ক্রিকেট থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে এই শাস্তি বিনা বাক্যে মেনেও নিয়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় এই মঞ্চের এমন বেহাল দশা নিয়ে ক্ষুব্ধ বোর্ড সভাপতি তাই কোনো রকম আপস করতে রাজি নন বলে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।
বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ফাহিম সিনহার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি বাদে সবাই প্রাথমিক শর্তের চরম লঙ্ঘন করেছে। ব্যাংক গ্যারান্টির বদলে স্রেফ কাগজের চেক জমা দিয়ে তারা চরম অপেশাদারিত্বের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তামিম জানান, ‘অস্থায়ী ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর এমন স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিসিবির প্রায় ষোলো কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।’ এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম ফ্র্যাঞ্চাইজির দায়িত্ব নেওয়ার কারণেই বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়েছে বোর্ডকে। ঘরোয়া লীগের এই অব্যবস্থাপনার দায় পূর্ববর্তী গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ওপর চাপান তিনি। নিষিদ্ধ ব্যক্তিকে দলের মালিকানা দেওয়া এবং নির্ধারিত অর্থের চেয়ে অনেক কম টাকা নেওয়ার মতো ভয়ংকর অনিয়মগুলো তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তামিমের মতে, ‘এটি নিছক কোনো ভুল নয়, বরং পুরোপুরি পরিকল্পিত অপরাধ।’ এমন জঘন্য আর্থিক অনিয়মের পেছনে জড়িতদের দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় আনার কঠোর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন দেশের সাবেক এই ড্যাশিং ওপেনার।
বোর্ডের বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, রাতারাতি দল কেনার অপসংস্কৃতি থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে। বিসিবি প্রধান মনে করেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে হলে বিদেশি প্রতিষ্ঠিত লগ্নিকারকদের আকর্ষণ করা ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প নেই।’
‘ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই’ নীতি মেনে চলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সফল মডেল অনুসরণ করে লীগের মান বাড়ানোর তাগিদ দেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এলে স্থানীয় দলগুলোর অর্থনৈতিক ভিত যেমন মজবুত হবে, তেমনি পেশাদারিত্বের অভাবও দূর হবে। ‘পারিশ্রমিক নিয়ে খেলোয়াড়দের সাথে চুক্তির খেলাপ করাটা শুধু বোর্ডের নয়, গোটা দেশের ভাবমূর্তিকেই মারাত্মকভাবে নষ্ট করে’ বলে মন্তব্য করেন বোর্ড সভাপতি। বাইরের দুনিয়ায় যখন দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর অপেশাদার আচরণের খবর পৌঁছায়, তখন বিশ্বমঞ্চে ক্রিকেটের পাশাপাশি দেশের সুনামও দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
