তিস্তার জলে ড্রাগনের ছায়া, বাংলার মাটিতে নতুন সমীকরণ

তিস্তার জলে ড্রাগনের ছায়া, বাংলার মাটিতে নতুন সমীকরণ

ফন্ট সাইজ:

ইতিহাস মাঝেমধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি করে, যেখানে একটি নদীর গতিপথ বদলে দেয় একটি জাতির ভাগ্য। তিস্তা সেই নদী। আর এই তিস্তাকে ঘিরে এখন যে ভূরাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, তার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়।

বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর বৈঠকে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। শুনতে নিছক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মতো মনে হলেও এই একটি পদক্ষেপের ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক বড় বার্তা। বার্তাটি শুধু ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নয়, বরং ঢাকা-দিল্লি-বেইজিং ত্রিভুজের এক নতুন জ্যামিতির।

এখানেই আসে পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গ। মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ঐতিহাসিক জয় ঘটেছে। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস হটে গেছে, ভবানীপুরে স্বয়ং মমতাও হেরেছেন। পশ্চিমবঙ্গে এখন পদ্মের রাজত্ব। কিন্তু এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের উপরেও।

তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের একটি খোলা ক্ষত হয়ে আছে। মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গ বারবার তিস্তা চুক্তিতে বাধা দিয়েছে, দিল্লিকে অসহায় দর্শক বানিয়ে রেখেছে। এখন বিজেপি যদি কলকাতার মসনদে বসে, তাহলে কি তিস্তার জট খুলবে? নাকি কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সুর মিললেও নতুন কোনো হিসাব-নিকাশ সামনে আসবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও কুয়াশাচ্ছন্ন।

আর ঠিক এই কুয়াশার সুযোগেই বাংলাদেশ চীনের দিকে হাত বাড়িয়েছে। এটি কি কূটনৈতিক চাপের কৌশল, নাকি সত্যিকারের বিকল্প খোঁজার প্রচেষ্টা? সম্ভবত দুটোই। বাংলাদেশ বুঝতে পেরেছে, ভারতের উপর একমাত্র নির্ভরতা আর কাজ করছে না। তিস্তার পানি না পেলে উত্তরবঙ্গের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ সবকিছু বিপন্ন। সেই বিপদ ঠেকাতে চীনের প্রকৌশল ও অর্থায়নের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর চিন্তা করা অযৌক্তিক নয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, চীনের বিনিয়োগ কি বিনামূল্যে আসে? বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ছায়ায় যে দেশগুলো ঢলে পড়েছে, তাদের অনেকের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর থেকে পাকিস্তানের ঋণের ফাঁদ এই উদাহরণগুলো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মাথায় রাখতেই হবে। তিস্তার জলে ড্রাগনের ছায়া যেন বাংলাদেশকে এক অদৃশ্য বন্ধনে না জড়িয়ে ফেলে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সমর্থনের কথাও বৈঠকে উঠে এসেছে। চীন মিয়ানমারের উপর প্রভাব রাখে, এটা সত্য। কিন্তু সেই প্রভাব কতটা বাংলাদেশের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, সেটা নির্ভর করে বেইজিং তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে কোথায় রাখছে তার উপর। কূটনীতির ভাষায় "সমর্থন" মানেই "সমাধান" নয়।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান এবং বাংলাদেশের চীনমুখী কূটনীতি এই দুটি ঘটনা আলাদা আলাদা দেখলে অর্থহীন, কিন্তু একসাথে দেখলে এক গভীর আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। ভারত তার প্রতিবেশী নীতিতে নতুন করে ভাবছে, চীন তার প্রভাব বলয় বিস্তার করছে এবং বাংলাদেশ এই দুই পরাশক্তির মাঝখানে নিজের সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে।

এই সুবিধা আদায়ের খেলা যতটা সম্ভাবনাময়, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। তিস্তার পানি পেতে গিয়ে যদি সার্বভৌমত্বের মাটি বিকিয়ে যায়, তাহলে সেই লাভ আসলে লাভ নয় সেটা হবে এক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির শুরু। বাংলাদেশের কূটনীতিকদের তাই মাথা ঠান্ডা রেখে, চোখ খোলা রেখে, নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই জটিল সমীকরণ সামলাতে হবে। ইতিহাস ক্ষমা করে না তাদের, যারা মুহূর্তের সুবিধায় ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখে।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]

Anrmasd

২ মাস আগে

Would have been good to have a comparative summary how BD got benefited/betrayed by India till today starting from the inception of Bangladesh!!

Andalib

২ মাস আগে

My hunch is India will start Teesta water sharing discussions with Bangladesh soon to doom the chances of any Teesta barrage by China. Once any Teesta water sharing agreement is reached, it will be difficult for Bangladesh to justify building Teesta barrage.

Syed Jahangir Kabir

২ মাস আগে

Andalib: Teesta water sharing & Teesta Barrage project(TB) r not contradictory to each other,rather comprehensive. By TB we will improve river basin,store water & reclaim land to reuse for agriculture & township.There is nothing here against India.

মন্তব্য করুন