আমরা ও সন্তানরা কোথায় নিরাপদ?

ফন্ট সাইজ:

ভোর হলে মানুষ ঘর থেকে বের হয় রুটি-রুজির সন্ধানে—কেউ রিকশা চালাতে, কেউ অফিসে, কেউ সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে। দিনের শেষে সবার একটাই চাওয়া—নিরাপদে ঘরে ফেরা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে এই স্বাভাবিক চাওয়াটাই অনিশ্চয়তায় ভরা। আমরা জানি না, পথে বের হলে ফিরতে পারব কি না; সন্তানকে মাদ্রাসা বা স্কুলে পাঠালে সে নিরাপদ থাকবে কি না। এই অজানা ভয়ই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। অপরাধ এখন আর লুকিয়ে নেই, বরং চোখের সামনে, দিনের আলোয়, প্রকাশ্যে, নির্লজ্জভাবে ঘটছে।

এসব দেখে এবং শুনে আমাদেরকে লজ্জা পাওয়া উচিত নয়? নেত্রকোনার সেই ১১ বছরের শিশুটির কথা ভাবুন। একটি ছোট্ট মেয়ে, যার জীবন হওয়ার কথা ছিল খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্নে ভরা—সে আজ ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। যে মানুষটাকে সে ‘হুজুর’ বলে সম্মান করত, সেই মানুষই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে এমন অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি আমাদের সমাজের জন্য এক গভীরতম লজ্জা। একইভাবে পটুয়াখালীর ঘটনাও আমাদের চোখ খুলে দেয়।

৯ বছরের একটি শিশুকে বলাৎকার করেছে তার শিক্ষক। যে জায়গাগুলোকে আমরা সবচেয়ে নিরাপদ ভাবি—মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়—সেখানেই নিয়মিত বিরতিতে এমন ঘটনা ঘটছে। হত্যা, ছিনতাই,অপহরণ ও চাঁদাবাজি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আমরা ও আমাদের সন্তানরা তাহলে কোথায় নিরাপদ? এই প্রশ্ন আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন আমরা রাজধানীর উত্তরা এলাকার ঘটনাটি দেখি। একজন বাবা তার মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। হঠাৎ করে কিছু দুষ্কৃতিকারী সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্যের মতো করে এসে তার সামনে থেকেই মেয়েটিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল।

একজন বাবা যদি নিজের চোখের সামনে থেকে সন্তানকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? এগুলো কি শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা? না, বরং এগুলো একই চিত্রের আলাদা আলাদা অংশ। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাগুলো দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সেখানে র‌্যাবের সদস্যদের ওপর হামলা হয়েছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। পুলিশের ওপর হামলা করে আসামিকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। টহলরত পুলিশকে আক্রমণ করে তাদের অস্ত্র পর্যন্ত নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। একটু ভেবে দেখুন—যে পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা দেয়, তারাই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? এই ঘটনাগুলো শুধু অপরাধ নয়, এগুলো আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার দুর্বলতার প্রমাণ। অপরাধীরা এখন ভয় পায় না। কারণ তারা জানে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা পার পেয়ে যাবে। এখানেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এখানটাতেই আমরা সবচেয়ে বেশি দুর্বলতা দেখছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে—পেশাদারিত্বের পরিবর্তে ভেতরে ভেতরে বিভাজন, প্রভাব এবং একটি ‘দুষ্টচক্র’ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পতিত ফ্যাসিবাদ আমলের মতোই কিছু জুনিয়র কর্মকর্তার মুঠো বন্দী হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই বাহিনী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—যেসব কর্মকর্তা সৎ, মেধাবী এবং পেশাদার হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেককেই নানা অভিযোগের মাধ্যমে কোণঠাসা করা হচ্ছে। যদি এই অভিযোগগুলো সত্যি হয়, তাহলে এটি শুধু ব্যক্তিগত অন্যায় নয়—এটি পুরো পুলিশ বাহিনীর জন্য এক মারাত্মক অশনি সংকেত।

কারণ এতে সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন, আর অসৎরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। এতে বাহিনীর ভেতরের নৈতিক মনোবল ভেঙে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। আরেকটি বাস্তবতা এখানে উল্লেখ করতেই হবে—যেখানে মানুষের নিরাপত্তা নেই, সেখানে পুলিশের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার বদলে পোশাকের রং বদলাতে বেশি মনোযোগী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাহ্যিক পরিবর্তন দিয়ে অভ্যন্তরীণ সংকট ঢেকে রাখা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা হলো—অনুগত, চাটুকার প্রকৃতির কর্মকর্তারা কখনোই একটি সরকারের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এই সত্যটি অনেক সরকারই উপলব্ধি করে তখনই, যখন তাদের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো চাঁদাবাজি। এটি এখন অনেক জায়গায় নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা করতে চাইলে টাকা দিতে হবে, না দিলে হয়রানি, হামলা, এমনকি জীবনহানির ঝুঁকি। সাধারণ মানুষ চুপ করে থাকে, কারণ তারা ভয় পায়।

এই ভয়টাই এখন আমাদের সমাজকে গ্রাস করছে। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থার দিকে যাচ্ছি, যেখানে মানুষ আইন নয়, ভয়কে মানতে শুরু করেছে। এটি একটি সমাজের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? প্রথমত, বিচারহীনতা। অনেক অপরাধেরই সঠিক বিচার হয় না বা হতে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে অপরাধীরা সাহস পায়। দ্বিতীয়ত, প্রভাবশালী মহলের ছায়া। অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা একা কাজ করে না; তাদের পেছনে শক্তিশালী কেউ না কেউ থাকে। তৃতীয়ত, আমাদের সামাজিক অবক্ষয়। আমরা ধীরে ধীরে মূল্যবোধ হারাচ্ছি। ছোটবেলা থেকে নৈতিকতার যে শিক্ষা পাওয়ার কথা, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। তবে আমাদের বর্তমান অবক্ষয়শীল পরিস্থিতির জন্য ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রভাবও অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আজ এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বাকস্বাধীনতার নামে মিথ্যাচার, গালাগাল, অন্যের চরিত্র হনন যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো ইতরামি, ফাজলামি ও অসভ্যতার উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে বিকৃত চিন্তা ও অস্বাস্থ্যকর চিত্রনাট্যের নাটক-সিনেমাও সমাজের মানসিক গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—যা এই অবক্ষয়ের পেছনে মোটেও কম দায়ী নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আইন দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মানুষ যদি নিজের ভেতর থেকে ভালো-মন্দের বোধ হারিয়ে ফেলে, তাহলে কোনো আইনই তাকে থামাতে পারে না। আজ আমরা এমন একটা সময়ে আছি, যেখানে—ছোট ছোট শিশুরাও নিরাপদ নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষের ভরসা কমে যাচ্ছে। রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও হামলার শিকার হচ্ছে। এসবই আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

যদি আমরা তা বুঝতে পারি। পরিশেষে বলা যায়, এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে—অপরাধীর কোনো পরিচয় নেই, সে যে-ই হোক, তাকে শাস্তি পেতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করতে হবে, যাতে তারা ভয় ছাড়াই কাজ করতে পারে। বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে, যাতে মানুষ আস্থা পায়। আর আমাদের সমাজকে ফিরতে হবে নৈতিকতার পথে। পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল, মাদ্রাসা—সব জায়গায় নৈতিকতা, মানবিকতা, সম্মানবোধ আর দায়িত্ববোধ শেখাতে হবে। কারণ ভালো সমাজ গড়ে ওঠে ভালো মানুষের মাধ্যমে। সুতরাং আমরা যদি আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ চাই, তাহলে এখনই আমাদের জেগে উঠতে হবে। গড়ে তুলতে হবে এক নতুন বাংলাদেশ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।

ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন