এক ডজনেরও বেশি নারী মার্কিন কংগ্রেসের সাবেক সদস্য এরিক সোয়ালওয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি তাদেরকে অস্বস্তিতে ফেলতেন। ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলতেন। একজন তরুণ কংগ্রেশনাল স্টাফার জানান, ক্যাপিটল হিল অফিসে কথা বলার পর সোয়ালওয়েল তাকে স্ন্যাপচ্যাটে অশালীন মেসেজ পাঠান এবং নিজের বিজনেস কার্ড তার পেছনের পকেটে গুঁজে দেন। আরেক তরুণী একটি নীতিগত বিষয়ে অনলাইনে সোয়ালওয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
তিনি বলেন, সোয়ালওয়েল বারবার তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ মেসেজ পাঠাতেন। তাকে ওয়াশিংটন ডিসিতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কখনো সরাসরি দেখা না হওয়া সত্ত্বেও তার জন্য সুপারিশপত্র লিখেছিলেন। ওই তরুণী বলেন, সে আমাকে স্ন্যাপচ্যাট করত। বলত- তুমি ভবিষ্যতে কী করতে চাও? তারপর হঠাৎ বলত- এই মুহূর্তে তুমি কী পরেছ?
সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা এক ডজনের বেশি নারী গত এক দশকে সোয়ালওয়েলের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে আছে সোশ্যাল মিডিয়া বার্তা থেকে সরাসরি সাক্ষাৎ পর্যন্ত। তবে কেউ কেউ প্রতিশোধ নেয়া হবে এই আশঙ্কায় নাম প্রকাশ করতে চাননি। এই অভিযোগগুলো আগে কখনো প্রকাশ হয়নি। এগুলো সোয়ালওয়েলের আচরণের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। গত মাসে সাবেক এক স্টাফার অভিযোগ করেন যে, সোয়ালওয়েল তাকে ধর্ষণ করেছিলেন। এরপর সোয়ালওয়েল ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান এবং কংগ্রেস থেকেও পদত্যাগ করেন। তবে সোয়ালওয়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বর্তমানে নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায় ফৌজদারি তদন্তের মুখোমুখি তিনি।
এই প্রতিবেদনে কথা বলা কোনো নারীই সরাসরি যৌন হামলার অভিযোগ করেননি। তবে তাদের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয়- একদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জনপ্রিয়তা অর্জন এবং নারীদের পক্ষে কথা বলা, অন্যদিকে একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নারীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও কখনো যৌন সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা- এই দ্বৈত আচরণ তিনি করতেন। সোয়ালওয়েলের আইনজীবী সারা আজারি এক বিবৃতিতে বলেন, সোয়ালওয়েল তার বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি যৌন অসদাচরণ ও হামলার অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছেন। তিনি বলেন, কিছু নারীর অভিযোগ সোয়ালওয়েল অস্বীকার করেছেন এবং অন্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল স্বাভাবিক ও পেশাদার।
তিনি এটাও স্বীকার করেন, সোয়ালওয়েলের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। আজারি বলেন, তার বিবাহের বাইরে নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল- এটা তিনি অস্বীকার করছেন না। কিন্তু সেটি জোরপূর্বক যৌন অসদাচরণের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সিএনএন যখন আজারির কাছে এসব অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য চায়, তার পরের রাতেই সোয়ালওয়েল নিজে দুই নারীর কাছে স্ন্যাপচ্যাটে বার্তা পাঠান। একজনকে তিনি রাত ২টার দিকে লিখেছেন- ‘তুমি কেন আমার স্ন্যাপের স্ক্রিনশট নিচ্ছ?’ কিছু নারী বলেন, সোয়ালওয়েলের আচরণ ছিল ‘জেকিল অ্যান্ড হাইড’-এর মতো। একদিকে তিনি নারীদের অধিকার রক্ষাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতেন, অন্যদিকে ব্যক্তিগতভাবে নারীদের প্রতি অনুপযুক্ত আচরণ করতেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজের স্টাফসহ অন্যান্য ক্যাপিটল হিল কর্মীদের প্রতিও যৌন আগ্রহ দেখাতেন। নারীদের অনুমতি ছাড়া নিজের নগ্ন ছবি পাঠাতেন এবং অন্তত দুই নারীকে যৌনভাবে নির্যাতন করেছিলেন। নারীরা বলেন, সোয়ালওয়েল যখন কংগ্রেসে ক্ষমতা বাড়াচ্ছিলেন, হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির সদস্য হচ্ছিলেন এবং গভর্নর হওয়ার প্রচার চালাচ্ছিলেন, তখনও এই আচরণ চলছিল। ন্যাশনাল উইমেনস ডিফেন্স লিগের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এমা ডেভিডসন ট্রিবস বলেন, এ ধরনের আচরণ একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ব্ল্যাকমেইল বা প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে- যা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই সোয়ালওয়েল উচ্চাকাক্সক্ষী ও প্রতিভাবান ছিলেন। তবে নারীদের সঙ্গে আচরণে সমস্যা ছিল বলে সহপাঠীরা জানান। আইওয়াতে জন্ম এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ডাবলিনে বেড়ে ওঠা সোয়ালওয়েল নর্থ ক্যারোলাইনার ক্যাম্পবেল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। কলেজে তিনি মক ট্রায়াল টিমের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তবে দুই সহপাঠী জানান, তিনি মাঝে মাঝে নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করতেন। ২০০১ সালে লেখা তার একটি কবিতা ‘হ্যাংওভার ফ্রম বারগান্ডি’ একটি বিশৃঙ্খল সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে তার আইনজীবী বলেন, এটি ‘মদ্যপান নিয়ে একটি রূপক, যৌনতা নয়।’ পরে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড থেকে আইন ডিগ্রি নিয়ে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করেন এবং ২০১০ সালে সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হন।
মিটু আন্দোলনের সময় সোয়ালওয়েল নিজেকে নারীদের পক্ষে একজন কণ্ঠ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি কর্মক্ষেত্রে নারীদের সুরক্ষার পক্ষে কথা বলেন এবং আইন প্রণয়নে অংশ নেন। কিন্তু একই সময়ে অভিযোগ ওঠে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নারীদের সঙ্গে অনুপযুক্ত আচরণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০১৮ সালে লস অ্যানজেলেসের এক নারী লোনা ড্রুস অভিযোগ করেন, সোয়ালওয়েল তাকে মাদক প্রয়োগ করে ধর্ষণ করেন। তবে এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং সোয়ালওয়েল তা অস্বীকার করেন। ২০১৯ সালে আরেক স্টাফার অভিযোগ করেন, সোয়ালওয়েল তার সঙ্গে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক করেন এবং পরে নিউইয়র্কের একটি হোটেলে তাকে ধর্ষণ করেন, যা এখন তদন্তাধীন। ২০২১ সালে লাস ভেগাসের কসমোপলিটান হোটেলে ধারণ করা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে এক নারীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যায়।
