অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ: বিজেপি পূর্ব ভারতের বলয় সম্পূর্ণ করল

এনডিটিভির বিশ্লেষণ

অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ: বিজেপি পূর্ব ভারতের বলয় সম্পূর্ণ করল

ফন্ট সাইজ:

‘এবার আমি এক ধরনের সুনামি দেখতে পাচ্ছি।’ পশ্চিমবঙ্গে ভোট গণনা শুরুর দশ দিন আগে, কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, খুব শিগগিরই ‘অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গ’-এ বিজেপি সরকার হবে। পশ্চিমবঙ্গে এমন এক ঐতিহাসিক জনরায়ের ইঙ্গিত মিলছে, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস টানা তিন মেয়াদের শাসন শেষে ক্ষমতা ছাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে বলা যায়, এই তিন প্রাচীন রাজ্য কার্যত দখল হয়ে গেছে।
বিজেপির কাছে এটি ভারতের পূর্বাঞ্চলে বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ওড়িশা পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক করিডর সম্পূর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়া।
বিহার অর্থাৎ প্রাচীন অঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে জাতিভিত্তিক জোট রাজনীতির কেন্দ্র ছিল। ওড়িশা অর্থাৎ কলিঙ্গ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে আঞ্চলিক নেতা নবীন পট্টনায়কের একচ্ছত্র আধিপত্যে ছিল। আর বঙ্গ ছিল সবচেয়ে আদর্শগতভাবে প্রতিরোধী অঞ্চল, যেখানে আঞ্চলিক পরিচয় বারবার বিজেপির অগ্রযাত্রাকে আটকে দিয়েছে। এখন বঙ্গও বিজেপির দখলে। ফলে দলটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যে লক্ষ্য তৈরি করছিল- পূর্ব ভারতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তা অর্জন করল।

ঐতিহাসিক রাজ্যগুলো
অঙ্গ এই তিন রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। বর্তমান বিহারের রাজনৈতিক কেন্দ্রভূমির সঙ্গে সম্পর্কিত। মহাভারতে এটি সেই রাজ্য, যা দুর্যোধন কর্ণকে উপহার দিয়েছিলেন। ইতিহাসে অঙ্গ পরে মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং উপমহাদেশের প্রাচীন রাজনৈতিক কাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখে। সেই অর্থে বিহার সবসময়ই ভারতের রাজনৈতিক কল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে এসেছে।

বঙ্গ ছিল পূর্বাঞ্চলের রাজ্য, যেখানে গঙ্গা নদী বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়ার আগে অসংখ্য শাখায় বিভক্ত হয়। আধুনিক বাংলা সেই ঐতিহ্য ধারণ করে ঔপনিবেশিক যুগে এক বৌদ্ধিক শক্তিতে পরিণত হয়। এখানেই বাংলার নবজাগরণ ঘটে, যা উপনিবেশবিরোধী রাজনীতিকে শক্তিশালী করে এবং উনিশ ও বিশ শতকের বড় অংশজুড়ে আধুনিক ভারতের বৌদ্ধিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

অন্যদিকে কলিঙ্গ পরিচিত তার বিজয় ও পরিণতির ইতিহাসের জন্য। সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নৈতিক ঘটনা। এই যুদ্ধের রক্তক্ষয় একজন সম্রাটকে বদলে দেয় এবং একটি সাম্রাজ্যের গতিপথ পরিবর্তন করে। আধুনিক ওড়িশাও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছিল। নবীন পট্টনায়ক ও তার দল বিজু জনতা দলের নেতৃত্বে ২৪ বছর ধরে বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

জয়যাত্রা
২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) বিহারের ২৪৩টির মধ্যে ২০২টি আসনে জয়লাভ করে, যেখানে বিরোধী মহাগঠবন্ধন নেমে আসে মাত্র ৩৫ আসনে। তেজস্বী যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) একসময় ৭৫টি আসন নিয়ে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছিল এবং মনে হয়েছিল বিহার নিতীশ কুমারের পরবর্তী রাজনৈতিক পর্যায়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই গতি ভেঙে পড়ে। আরজেডি নেমে আসে ২৫ আসনে, কংগ্রেস পায় ৬টি, আর বাম দলগুলো প্রায় ভেঙে পড়ে। বিজেপি পায় ৮৯টি আসন, জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ) ৮৫টি, চিরাগ পাসওয়ানের লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস) ১৯টি, জিতন রাম মাঞ্জির হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চা ৫টি এবং উপেন্দ্র কুশওয়াহার রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চা ৪টি আসন পায়।

বিহারে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টি, যাকে অনেকেই বড় পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু দলটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গ ছিল বিজেপির জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষার ক্ষেত্র। গত এক দশকে এখানে দলটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এলেও ক্ষমতা অধরা ছিল। সোমবারের গণনা বলে দেয় সেই বাধা বিজেপি সুনামিতে ভেঙে গেছে। ইলেকশন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ২০৬টিরও বেশি আসনে এগিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি মার্চে বলেছিলেন তিনি ভবানীপুরে এক ভোটে হলেও জিতবেন, শেষ পর্যন্ত বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,১০৫ ভোটে হেরে যান।

অবশেষে, ওড়িশা নাটকীয়ভাবে কলিঙ্গকে তুলে দেয়। বহু বছর ধরে এখানে বিজেপিকে সংগঠনগতভাবে দুর্বল বলে মনে করা হতো, এমনকি ‘সাইনবোর্ড পার্টি’ বলেও উপহাস করা হতো। ২০২৪ সালে সেই ধারণা ভেঙে পড়ে, যখন বিজেপি ওড়িশার ১৪৭টি আসনের মধ্যে ৭৮টি জিতে নেয়, নবীন পট্টনায়কের ২৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এবং বিজু জনতা দলকে নামিয়ে আনে ৫১ আসনে। কংগ্রেস পায় ১৪টি আসন, সিপিআই (এম) একটি এবং স্বতন্ত্ররা তিনটি।
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে লোকসভা নির্বাচনে, যেখানে একসময় প্রভাবশালী বিজু জনতা দল একটি আসনও জিততে পারেনি। বিজেপি পায় ২০টি আসন, কংগ্রেস পায় একটি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন