দোকানের তাকে সাজানো বিস্কুট, চিপস, কেক, কোমল পানীয়, ব্যস্ত জীবনের সহজ সমাধান হিসেবে কেনা ইনস্ট্যান্ট নুডলস, কিংবা নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাবার আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। শিশুর টিফিন থেকে অফিসের বিরতি, পথের ক্ষুধা থেকে ঘরের আড্ডা- সব জায়গায় এসব খাবারের উপস্থিতি বাড়ছে। সহজলভ্যতা এবং আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনই এই আগ্রাসী বিস্তারের মূল কারণ, যা নিরবেই তৈরি করছে এক মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকট।
প্রতিদিনের এসব প্যাকেটজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা অতিরিক্ত চিনি, লবণ (সোডিয়াম) ও সম্পৃক্ত চর্বি ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগজনিত। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ, আর প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি ৪ জনে ১ জন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
এ সব সংখ্যা কেবল স্বাস্থ্য খাতের পরিসংখ্যান নয়; এগুলো পরিবার হারানোর, আয় কমে যাওয়ার, চিকিৎসা ব্যয়ে নিঃস্ব হওয়ার এবং অকাল মৃত্যুর বাস্তব গল্প। অথচ এই সংকটের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, বিশেষ করে অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত খাবার সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কতা, এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একজন সাধারণ ক্রেতা যখন বাজারে গিয়ে একটি প্যাকেটজাত খাবার কিনছেন, তখন তিনি কি সত্যিই জানেন সেটি কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ কিংবা এতে কতটা চিনি, লবণ বা ক্ষতিকর চর্বি আছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর হবে- না। কারণ প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে, জটিল ভাষায় এবং সংখ্যার ছকে যে পুষ্টি-তথ্য দেওয়া থাকে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে দ্রুত বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
জীবনের ব্যস্ততায় দোকানে দাঁড়িয়ে কেউ চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি কিংবা সোডিয়ামের মাত্রা হিসাব করেন না। ফলে ভোক্তা পণ্য কিনছেন, কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য তাঁর চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে কার্যকর নিউট্রিয়েন্ট প্রোফাইল মডেলের ভিত্তিতে গৃহীত ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং বা এফওপিএল। সহজভাবে বললে, এটি এমন একটি খাদ্য লেবেলিং ব্যবস্থা যেখানে কোনো পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ (সোডিয়াম) বা ক্ষতিকর চর্বি থাকে, তাহলে প্যাকেটের সামনের অংশে সহজ, বোধগম্য ও স্পষ্টভাবে সতর্কবার্তা দিতে হয়। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিতথ্য আর প্যাকেটের পেছনে লুকিয়ে থাকবে না; ক্রেতা এক নজরেই বুঝবেন পণ্যটি তাঁর বা তাঁর পরিবারের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য অথবা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, সতর্কতাভিত্তিক এফওপিএল একটি কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ৪৪টি দেশ স্বেচ্ছামূলক বা বাধ্যতামূলকভাবে এফওপিএল চালু করেছে। চিলি, মেক্সিকো, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পেরু, কানাডাসহ মোট ১০টি দেশে সতর্কবার্তাভিত্তিক এফওপিএল বাধ্যতামূলক। চিলি, মেক্সিকো, উরুগুয়ের মতো দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর ভোক্তারা এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ কমিয়েছে , উৎপাদকরা তাদের পণ্যে চিনি, লবণ (সোডিয়াম) ও ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা কমাতে উৎসাহিত হয়েছেন। অর্থাৎ, এই নীতি ক্রেতার আচরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি উৎপাদককেও দায়িত্বশীল করে তোলে এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশেও এমন নীতির প্রয়োজনীয়তা এখন স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার খেয়ে থাকেন। বিস্কুট, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, স্ন্যাকস ও চিনিযুক্ত পানীয় আমাদের খাদ্যতালিকায় দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে। অনেক পণ্যে উচ্চমাত্রার লবণ, চিনি ও ক্ষতিকর চর্বি পাওয়া গেছে। আবার অনেক প্যাকেটেই প্রয়োজনীয় পুষ্টিতথ্য অনুপস্থিত বা অসম্পূর্ণ। অর্থাৎ ভোক্তা শুধু ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যই কিনছেন না, বরং সঠিক তথ্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ প্রেক্ষাপটে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ “নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬”-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে, যা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। এতে প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয়ের মোড়কে বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ এফওপিএল চালুর প্রস্তাব রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্ধারিত মাত্রার বেশি চিনি, সোডিয়াম বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকলে প্যাকেটের সামনের প্রধান অংশে কালো অষ্টভুজাকৃতির সতর্কবার্তা দিতে হবে। যেমন “অতিরিক্ত চিনি”, “অতিরিক্ত সোডিয়াম” বা “অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি”। এই পদ্ধতি সহজবোধ্য, দৃশ্যমান এবং আন্তর্জাতিকভাবে সর্বোত্তম ও কার্যকর হিসেবে স্বীকৃত। সরকারের এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে খসড়া তৈরি করাই শেষ কথা নয়। এটি দ্রুত চূড়ান্তকরণ এবং বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ ও কঠোর তদারকি অত্যন্ত জরুরি।
এক্ষেত্রে বিলম্ব মানে আরও ঝুঁকি, আরও অসুস্থতা। তাই জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে নীতিনির্ধারকদের অবস্থান হতে হবে স্পষ্ট। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকায় দিতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিককে সঠিক তথ্য দিয়ে সুরক্ষা দেওয়া। তাই এফওপিএল নীতি হতে হবে বাধ্যতামূলক, বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডভিত্তিক এবং শিল্পখাতের অযাচিত প্রভাবমুক্ত। একইসঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ ও নাগরিক সমাজের মাধ্যমে প্যাকেটের সামনে সতর্কবার্তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এটি ভোক্তার অধিকার, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক মাধ্যম।
বাংলাদেশ এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে খাদ্যাভ্যাসজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি-এর ৩.৪-এ ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরোধ ও চিকিৎসার মাধ্যমে অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জনের একটি বাস্তবসম্মত ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হতে পারে বাধ্যতামূলক এফওপিএল। প্যাকেটের সামনে অতিরিক্ত চিনি, লবণ (সোডিয়াম) ও সম্পৃক্ত চর্বি সম্পর্কে স্পষ্ট ও বোধগম্য সতর্কবার্তা থাকলে একজন ক্রেতা সচেতনভাবে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন করতে পারবেন, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য গ্রহণ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের চাপ কমানো সম্ভব হবে।
তাই এফওপিএল শুধু খাদ্য লেবেলিং নীতি নয়; এটি এসডিজি ৩.৪ অর্জনে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সুতরাং “নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬” দ্রুত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। রঙিন মোড়কের আড়ালে স্বাস্থ্যঝুঁকি লুকিয়ে থাকার দিন শেষ হওয়া দরকার। প্যাকেটের সামনে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তাই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে। শিশু, তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশ ও অসংক্রামক রোগ থেকে রক্ষার জন্য খসড়া প্রবিধানমালাটি আর বিলম্ব না করে চূড়ান্ত করা জরুরি।
