বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি চুক্তি বা একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক শক্তিকাঠামোর পালাবদলের ইঙ্গিত বহন করে। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বের বৃহত্তম খনি কোম্পানি বিএইচপি-র সঙ্গে চীনের সাম্প্রতিক চুক্তি ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত। দশকের পর দশক ধরে যে লৌহ আকরিকের বাজার ছিল মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র অধিপত্যের মঞ্চ, সেখানে এবার চীনা ইউয়ানের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এটি কি নিছক একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা, নাকি বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের এক সুদূরপ্রসারী সূচনা?
এই ঘটনার গভীরতা বুঝতে হলে ইতিহাসের পাতায় একটু ফিরে তাকানো দরকার। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনের পর থেকে মার্কিন ডলার বিশ্বের একমাত্র রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে যে আসনে বসেছিল, তা আজও অটুট তবে ক্রমশ টলমলে। ১৯৭১ সালে নিক্সন সোনার বিনিময় ব্যবস্থা বাতিল করে ডলারকে ভাসমান মুদ্রায় পরিণত করেন। তারপরেও পেট্রোডলার ব্যবস্থা, অর্থাৎ তেলসহ প্রধান পণ্যের বৈশ্বিক মূল্য নির্ধারণে ডলারের ব্যবহার, আমেরিকার আর্থিক আধিপত্যকে নিরঙ্কুশ রেখেছিল। কিন্তু এখন সেই আধিপত্যে ফাটল ধরছে একে একে, ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।
চীন এই পরিবর্তনের মূল কারিগর। বেইজিং বুঝেছে যে কোনো দেশের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কেবল সামরিক শক্তিতে নয়, মুদ্রার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতায়ও নিহিত। সেই লক্ষ্যে চীন গত দেড় দশকে একের পর এক কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে ইউয়ানে জ্বালানি বাণিজ্যের চুক্তি, ২০২৩ সালে ব্রাজিলের সঙ্গে রিয়াল-ইউয়ান বাণিজ্য নিষ্পত্তি চুক্তি, সৌদি আরবের সঙ্গে পেট্রোইউয়ানের আলোচনা এই পদক্ষেপগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি সুচিন্তিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। এবার বিএইচপি-র মতো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী খনি কোম্পানিকে নতি স্বীকার করিয়ে চীন স্পষ্ট বার্তা দিল কমোডিটি বাজারে নতুন নিয়ম প্রণেতা এখন বেইজিং।
এই পরিবর্তনের পেছনে কেবল চীনের একক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নীতিগত ভুলও দায়ী। ওয়াশিংটন বারবার ডলার-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। রাশিয়াকে সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করা, ইরান ও ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা, এমনকি ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ এসব পদক্ষেপ বিশ্বের বহু দেশকে এই উপলব্ধিতে পৌঁছে দিয়েছে যে ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানে যেকোনো মুহূর্তে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক হাতিয়ারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি। ভারত রুশ তেল রুপিতে কিনছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারত দিরহাম-রুপিতে তেল লেনদেনের চুক্তি করেছে, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় চীনের ইউয়ান-নিষ্পত্তি কেন্দ্র গড়ে উঠছে এই সামগ্রিক চিত্র বলছে, বহুমেরু মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে।
আইএমএফের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে ডলারের অংশ ১৯৯৯ সালের ৭১ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ইউয়ানের অংশ ২০২০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতো মার্কিন ব্যাংক পর্যন্ত চীনের অফশোর ঋণ বাজারে ঝুঁকছে, এই তথ্য নিজেই বলে দেয় পরিবর্তনের গভীরতা কতটুকু।
এই বৈশ্বিক পটপরিবর্তনে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ চীনের সঙ্গে সংযুক্ত। চীন থেকে আমদানি ব্যাপক, এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় বিনিয়োগও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে যদি ইউয়ানে লেনদেনের সুযোগ বাড়ে, তাহলে একদিকে ডলার-সংকটের চাপ কিছুটা কমতে পারে, অন্যদিকে মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি ও চীনের ওপর কৌশলগত নির্ভরতার নতুন ফাঁদও তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে টাকা-রুবল বাণিজ্যের আলোচনা করেছে, ভারতের সঙ্গে রুপিতে লেনদেনের পথ খুলেছে। কিন্তু এই বহুমুখী মুদ্রা কূটনীতিতে সফল হতে হলে শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নীতি নয়, একটি সুচিন্তিত ও সক্রিয় কৌশল দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইউয়ানের উত্থান কি সত্যিই ডলারকে সরিয়ে দেবে? বাস্তবতা হলো, ডলারকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপন করার মতো অবস্থানে ইউয়ান এখনো নেই। চীনের পুঁজিবাজারের সীমাবদ্ধতা, মুদ্রার আংশিক রূপান্তরযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইউয়ানের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার পথে বড় বাধা। তবে যা ঘটছে তা হলো, একটি বহুমেরু মুদ্রা ব্যবস্থার উদ্ভব যেখানে ডলার, ইউয়ান, ইউরো এবং আঞ্চলিক মুদ্রাগুলো পাশাপাশি ব্যবহৃত হবে। বিএইচপি-চীন চুক্তি সেই বহুমেরু যাত্রার একটি মাইলফলক মাত্র।
ইতিহাস সাক্ষী, বিশ্বের আর্থিক শক্তিকেন্দ্রের পরিবর্তন কখনো রাতারাতি হয় না। ব্রিটিশ পাউন্ড থেকে মার্কিন ডলারের আধিপত্যে উত্তরণে দশকের পর দশক লেগেছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তন যখন এসেছিল, তখন তা ছিল অপরিবর্তনীয়। আজ যে ফাটল ধরছে, তা হয়তো এখনই ভাঙন নয় কিন্তু এটি সেই ভাঙনের পূর্বাভাস। বাংলাদেশসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে, তবে সাবধানতার সঙ্গে। কারণ পুরনো কর্তার জায়গায় নতুন কর্তা এলেই মুক্তি আসে না প্রকৃত মুক্তি আসে নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে।
ডলারের সিংহাসন কাঁপছে। কিন্তু কে বসবে সেই আসনে সেটি নির্ধারণ হবে আগামীর ভূরাজনীতি। এই মুহূর্তে সতর্ক, বিচক্ষণ ও স্বার্থসচেতন থাকাই ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় কৌশল।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
