ভোরের প্রথম আলো আকাশ ছুঁতে না ছুঁতেই শহরের রাস্তায় নেমে পড়েন রিকশাচালক—চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তার বেঁচে থাকার লড়াই। কোথাও কারখানার তীক্ষ্ণ সাইরেন ভেঙে দেয় নীরবতা, কোথাও ইটভাটার ধোঁয়া মিশে যায় কুয়াশার সঙ্গে, আবার কোথাও নির্মাণস্থলের ধুলোমাখা বাতাসে লেখা হয় নতুন দিনের গল্প। তাদের হাতের কড়া, ঘামে ভেজা শরীর—এসব কেবল পরিশ্রমের চিহ্ন নয়; এগুলোই একটি জাতির এগিয়ে চলার অদৃশ্য ভিত্তি, উন্নয়নের নীরব স্থপতির স্বাক্ষর। তবুও কত নির্মম বৈপরীত্য—যে শ্রমে দাঁড়িয়ে থাকে সমগ্র অর্থনীতি, সেই শ্রমের মর্যাদা আজও অনেকাংশে আটকে আছে স্লোগান আর আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে। তাই সর্বাগ্রে দরকার শ্রমকে প্রতিটি স্তরে সম্মান ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করা।
মে দিবস এলেই আমরা শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা বলি। সভা-সেমিনার, ব্যানার-ফেস্টুনে মুখর হয়ে ওঠে “শ্রমের মর্যাদা”র প্রতিশ্রুতি। কিন্তু দিবস শেষ হলে কি সেই প্রতিশ্রুতিগুলো শ্রমিকের জীবনে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনে? নাকি সেগুলো কেবলই ক্ষণস্থায়ী আবেগ, যা সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়?
বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা যাদের ঘামে ঘোরে, সেই শ্রমিকদের জীবনযাত্রার চিত্র এখনো বহুলাংশে সংগ্রামমুখর। তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস, সেখানে কাজ করা লাখো শ্রমিক প্রতিদিন একটি কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি হন—অল্প মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার ভেতর টিকে থাকার লড়াই। একটি শার্ট কিংবা জ্যাকেট যখন আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়, তখন সেই পণ্যের পেছনে থাকা শ্রমিকের প্রাপ্য কতটুকু—এই প্রশ্নটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতোই।
কেবল গার্মেন্টস নয়, কৃষিখাত, নির্মাণশিল্প, পরিবহন কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাত—সবখানেই একই বাস্তবতা। দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে নেই কোনো নিশ্চিত চুক্তি, নেই স্বাস্থ্যসেবা, নেই সামাজিক নিরাপত্তা। একজন দিনমজুরের জন্য একটি অসুস্থতা মানে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, বরং পুরো পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে যাওয়া। এই অনিশ্চয়তার জীবন কি সত্যিই শ্রমের মর্যাদার প্রতিফলন?
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রসঙ্গে আমরা প্রায়ই ‘ন্যূনতম মজুরি’র কথা বলি, কিন্তু ‘জীবনধারণযোগ্য মজুরি’ বা লিভিং ওয়েজের প্রশ্নটি এখনো প্রান্তিক। বাজারদর বাড়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, কিন্তু সেই হারে মজুরি বৃদ্ধি পায় না। ফলে শ্রমিকদের অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করেন—যা একদিকে তাদের স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, অন্যদিকে তাদের পরিবার ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। একটি দেশের উন্নয়ন কি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই উন্নয়নের বোঝা বহনকারীরা নিজেরাই ক্লান্ত ও অবহেলিত থাকে?
নিরাপত্তার প্রশ্নেও আমরা এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। বড় দুর্ঘটনার পর আমরা শোক প্রকাশ করি, তদন্ত কমিটি গঠন করি, নতুন আইন প্রণয়ন করি। কিছুদিনের জন্য সচেতনতা বাড়ে, নজরদারি জোরদার হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই তৎপরতা শিথিল হয়ে পড়ে, আর শ্রমিকরা আবারও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন।
উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে গিয়ে যদি শ্রমিকের জীবনই অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা মানবিক?
এই বাস্তবতার পেছনে একটি গভীর সামাজিক মানসিকতাও কাজ করে। আমাদের সমাজে এখনো শারীরিক শ্রমকে অনেক সময় নিম্নস্তরের পেশা হিসেবে দেখা হয়। আমরা “অফিসের চাকরি”কে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করি, কিন্তু যে মানুষটি ঘাম ঝরিয়ে একটি ভবন নির্মাণ করেন, তার প্রতি একই সম্মান দেখাতে পারি না। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বৈষম্য তৈরি করে না, বরং শ্রমের প্রকৃত মূল্যকেও খাটো করে।
অথচ বিশ্বে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে শ্রমকে মর্যাদা দেওয়া হয় দক্ষতা ও অবদানের ভিত্তিতে। সেখানে একজন কারিগর, একজন ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা একজন নির্মাণশ্রমিক সমাজে সম্মানজনক অবস্থান পান। কারণ তারা বোঝে—কোনো কাজই ছোট নয়, বরং প্রতিটি কাজই সমাজের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশে এই মানসিক পরিবর্তন না এলে আইন ও নীতিমালার উন্নয়নও পূর্ণ ফল দেবে না।
তবে আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রমখাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে অনেক কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবুও এই অগ্রগতি এখনো অসম এবং সীমিত—সব শ্রমিকের জীবনে এর প্রভাব সমানভাবে পড়েনি। এ সত্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালেও আমরা শ্রমিকদের অবদান স্পষ্ট দেখতে পাই। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল—এসব শুধু অবকাঠামো নয়, এগুলো শ্রমিকদের ঘাম, শ্রম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। কিন্তু এই উন্নয়নের গল্পে তাদের ব্যক্তিগত গল্পগুলো অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে তাদের কণ্ঠস্বর কতটা প্রতিফলিত হয়—সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশ্বায়নের যুগে শ্রমের ধরনও বদলাচ্ছে। গিগ ইকোনমি, ফ্রিল্যান্সিং, প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজ—এসব নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। কিন্তু একই সঙ্গে এই খাতগুলোতে শ্রমিকদের অধিকার, সুরক্ষা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। ফলে শ্রমের সংজ্ঞা যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি শ্রমিক সুরক্ষার কাঠামোকেও সময়োপযোগী করতে হবে।
শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা কোনো একক উদ্যোগের বিষয় নয়; এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক চুক্তি। সরকারকে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, মালিকপক্ষকে দায়িত্বশীল হতে হবে, শ্রমিক সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ হতে হবে, আর আমাদের প্রত্যেককে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের একটি উপাদান হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে—যার রয়েছে সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য জীবনের অধিকার।
পরিশেষে বলতে চাই,শ্রমের মর্যাদা তখনই বাস্তব হবে, যখন একটি শ্রমিক তার পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবে, যখন সে নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারবে, যখন তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাকে অনিশ্চয়তায় ভুগতে হবে না, এবং যখন সমাজ তাকে সম্মানের চোখে দেখবে। সুতরাং,শ্রম শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, বরং মর্যাদা ও মানবিকতার প্রতীক হয়ে ফুটে উঠুক উঠুক সর্বত্র এবং সবসময়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
