দার্শনিক ইয়ুর্গেন হেবারমাসের প্রয়াণে ‘যুক্তিবাদ ও গণতন্ত্রের এক প্রদীপ' শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেছিলাম। ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ ও রিফিউজি মাইগ্রেশন ল্যাব আয়োজিত স্মরণ সভায় বর্তমান কালের এই প্রভাবশালী চিন্তাবিদের জীবন ও কর্মের নানা দিক আলোচিত হয়। আমি স্পষ্টতই উল্লেখ করি, কখনও কখনও কোনো মানুষের মৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, একটি যুগের পরিসমাপ্তির মতো। আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম আলোকবর্তিকা ইয়ুর্গেন হেবারমাসের প্রয়াণও তেমনই এক নীরব অথচ গভীর শোকের মুহূর্ত। তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন যুক্তিবাদী মানবতার গণতন্ত্রকামী এক দীর্ঘ আলাপচারিতার যবনিকাপাত হলো। যেন নিভে গেলো যুক্তিবাদ ও গণতন্ত্রের এক প্রদীপ। হেবারমাস ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ ৯৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
১৯২৯ সালে জার্মানির ডুসেলডর্ফে জন্ম নেওয়া এই দার্শনিক এমন এক সময়ে বড় হয়েছিলেন, যখন ইউরোপের আকাশ যুদ্ধের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে অনেকেই ইতিহাসের প্রতি আস্থা হারিয়েছিল। কিন্তু হেবারমাস বিশ্বাস করেছিলেন—মানুষের মুক্তির পথ এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি; যতদিন মানুষের মধ্যে যুক্তি আছে, সংলাপ আছে, ততদিন সভ্যতার পথ খোলা থাকবে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের মধ্যে বেড়ে উঠলেও তিনি সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে নির্মাণ করেছিলেন। Theodor W. Adorno-এর উত্তরসূরি হয়েও তিনি কেবল সমালোচনার দর্শনে থেমে থাকেননি, বরং তিনি খুঁজেছেন এমন এক সমাজের সম্ভাবনা, যেখানে মানুষ ক্ষমতার কণ্ঠে নয়, যুক্তির ভাষায় কথা বলবে।
হেবারমাসের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের পারস্পরিক সংলাপের শক্তি। তাঁর ধারণায় সমাজ কেবল রাষ্ট্র বা বাজারের যন্ত্র নয়; এটি মানুষের যোগাযোগের এক জটিল ও প্রাণবন্ত ক্ষেত্র। সেই যোগাযোগের মধ্যেই জন্ম নিতে পারে সত্য, ন্যায় এবং গণতন্ত্রের বীজ। তাঁর বিখ্যাত ধারণা—“উৎকৃষ্ট যুক্তির চাপহীন চাপ”—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি কখনও কখনও নিঃশব্দ যুক্তি।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Structural Transformation of the Public Sphere আমাদের শিখিয়েছে জনপরিসরের অর্থ কী—কীভাবে নাগরিক সমাজ, সংবাদমাধ্যম এবং চিন্তার স্বাধীনতা মিলেই গড়ে ওঠে গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি। আর তাঁর বিশাল তাত্ত্বিক কাজ The Theory of Communicative Action মানবসমাজকে বোঝার জন্য একটি নতুন ভাষা তৈরি করেছে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পারস্পরিক বোঝাপড়া।
হেবারমাসের চিন্তা ছিল গভীরভাবে নৈতিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতীয়তাবাদের উগ্র আবেগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের সাংবিধানিক নৈতিকতা—যে নৈতিকতা নাগরিকদের একত্র করে স্বাধীনতা, সমতা এবং মানব মর্যাদার মূল্যবোধে। এই কারণেই তাঁর “সাংবিধানিক দেশপ্রেম” ধারণা আজও রাজনৈতিক তত্ত্বে এক শক্তিশালী আলোচনার বিষয়।
যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে তাঁর লেখা পড়েছেন, কিংবা গবেষণাগারে তাঁর তত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক করেছেন, তাঁদের কাছে হেবারমাস কেবল একজন দার্শনিক নন; তিনি ছিলেন এক দীর্ঘ বৌদ্ধিক সংলাপের সহযাত্রী। তাঁর লেখা যেন এক অন্তহীন আলাপ—যেখানে প্রশ্ন আছে, যুক্তি আছে এবং সত্যের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার ধৈর্য আছে।
তিনি একবার বলেছিলেন, যুক্তি ইতিহাসের ভেতরে সুড়ঙ্গ খননকারী এক প্রক্রিয়ার মতো—নিঃশব্দে এগিয়ে চলে, মাটির নিচে পথ তৈরি করে এবং একদিন হঠাৎ আলোয় উঠে আসে। আজ সেই যুক্তির সাধক আমাদের চোখের সামনে থেকে বিদায় নিলেন। কিন্তু তাঁর খনন করা সেই পথগুলো রয়ে গেছে—চিন্তার ভেতরে, বইয়ের পাতায় এবং মানবতার ভবিষ্যৎ স্বপ্নে।
সম্ভবত এটাই একজন সত্যিকারের দার্শনিকের উত্তরাধিকার—তিনি চলে যান, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে। তাঁর চিন্তার আলো নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাতে থাকে। ইয়ুর্গেন হেবারমাসের কণ্ঠ থেমে গেলেও যুক্তির সেই দীর্ঘ আলাপ শেষ হয়ে যায়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়ুর্গেন হেবারমাস স্মরণে আলোচনা করেন সমাজতাত্ত্বিক প্রফেসর এসএম মনিরুল হাসান, নৃবিজ্ঞানী প্রফেসর রাহমান নাসির উদ্দিন ও অন্যান্য শিক্ষকগণ। বাংলাদেশে হেবারমাসের চিন্তা ও দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে কথা বলেন সবাই। জোর দেন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় দার্শনিক শূন্যতা পূর্ণ করার উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়েও।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
