ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে আসুন আমরা এগিয়ে যাই বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আলোচনা ও অধিবেশন সমাপ্তির আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য দেয়ার সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে ধন্যবাদ জানান। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, শুরুর সংসদ অধিবেশন। এটি একটি ঐতিহাসিক অধিবেশন।
এই অধিবেশনের চেয়ার এবং স্পিকার হিসেবে অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য আমি অন্তরের অন্তস্তল থেকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আজকের এই গ্যালারিটা হচ্ছে বাংলাদেশ। এই গ্যালারির দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। এই গ্যালারির দিকে শুধু বাংলাদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যত বাংলাদেশি আছে তারা সবাই আজ তাকিয়ে আছে। তারা এটাকে তাদের একটা প্রত্যাশার ঠিকানা হিসেবে দেখতে চায়। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই অধিবেশন, নিশ্চয়ই আমরা সবাই বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে এখানে আমরা অংশগ্রহণ করেছি। আমি সরকারি দল, বিরোধী দল এই দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে, আগ্রহ ভরে অধিবেশনকে সফল করার জন্য আমি অভিনন্দন জানাই। এবং সেই সাথে অত্যন্ত খোলামেলাভাবে সবাই সবার মত ব্যক্ত করার ন্যূনতম সুযোগ পেয়েছেন, এজন্য আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছি।
আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে সব জায়গায় যে প্রবলেম এখানেও সেই একই প্রবলেম মদ, মাদকতা, কিশোর গ্যাং। এর সাথে সারা দেশের মতোই এখানে সীমাহীন, বলগাহীন, লাগামহীন চাঁদাবাজি। ফুটপাত দখল করে চাঁদা নিয়ে লোকদেরকে রাস্তার মধ্যে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও যারা নিজ নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা করেন তাদেরকেও চাঁদা দিয়েই ব্যবসা করতে হয়। ৫ই আগস্টের পর আমরা কি এমন একটা বাংলাদেশ চেয়েছি মাননীয় স্পিকার? কে চাঁদাবাজ আমি এটা শুনতে চাই না। চাঁদাবাজ আমি হলেও আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো হোক। চাঁদাবাজ কোনো দলের হতে পারে না, এরা দলের নাম ভাঙানো বর্ণচোরা। এদেরকে শনাক্ত করে এই সংসদ থেকে আমরা শপথ নিই যে এই চাঁদাবাজদেরকে যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশ থেকে নির্মূল করবো ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোকে সকল ধরনের সন্ত্রাস মুক্ত যেন রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়। আমরা আর দেখতে চাই না— যে দলেরই হোক, চাপাতির কোপে কিংবা আগ্নেয়াস্ত্রের বুলেট তার জীবন নিয়ে গেছে এটা দেখতে চাই না। আমরা দেখতে চাই শিশু হয়ে ঢুকবে, পরিণত মানুষ হয়ে ওখান থেকে বের হবে। আদর্শ সম্পন্ন নাগরিক হয়ে বের হবে, দেশপ্রেম বুকে নিয়ে বের হবে, দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে বের হবে। আমরা সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটাকে দেখতে চাই। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আছেন। দেশকে যদি আগাতে হয় তাহলে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এই দুইটাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার প্রাণ হচ্ছে টারশিয়ারি লেভেলে সেখানে রিসার্চ হবে, গবেষণা হবে। জাতির ভবিষ্যৎ ওখান থেকেই বের হয়ে আসবে। দুঃখের বিষয় গবেষণায় ফকিরের ভিক্ষা দেওয়া হয়। ফকিরের ভিক্ষা দেওয়ার কারণে ওই ভিক্ষাগুলোও লুটপাট হয়ে যায় অনেকে, সেগুলোও কাজে লাগে না। তবে আমি একটা সেক্টরকে বরাবর ধন্যবাদ দেই আজও ধন্যবাদ দেই, এটি হচ্ছে আমাদের কৃষি বিভাগ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, তাদের অর্জনকে আমরা অস্বীকার করা মানে নিজেকে অস্বীকার করার শামিল।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা যেমন বলেছি বিএনপি-ও তেমন বলেছে যে আমাদের পররাষ্ট্র নীতি হবে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি। সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা সেই জায়গাটা দেখতে চাই। এই জায়গাটা নিশ্চিত করুক সরকার, আমরা এটাই সরকারের কাছে প্রত্যাশা করি।
তিনি বলেন, আমাদেরকে বলা হয় মাঝে মাঝে আমাদের ট্রেজারি বেঞ্চের বন্ধুরা বলেন যে এমন কোনো কাজ আপনারা করবেন না যে কারণে আবার পতিত ফ্যাসিস্টরা ফিরে আসে। আমরা তো এটা চাই না। কিন্তু নির্বাচনের আগে আমরা দেখলাম কিছু কিছু সিনিয়র নেতা পর্যন্ত তাদেরকে আশ্বস্ত করে নিশ্চয়তা দিয়ে বলছেন আপনাদের সকল মামলা উঠিয়ে দেব। আপনাদের জন্য আমাদের দুয়ার খোলা, আপনাদেরকে আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেব। আমরা জানি না এখনো তাদের সেই সম্পর্ক বিদ্যমান আছে কিনা। আমাদের কথা একদম পরিষ্কার। যতগুলো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যতগুলা খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, যত জায়গায় মানবতা লঙ্ঘিত হয়েছে, ধর্ষণ হয়েছে এই প্রত্যেকটি অপরাধের বিচার করতে হবে এবং সেই বিচার ওসমান হাদি পর্যন্ত আসতে হবে। কিন্তু বিচারের দিকে তাকিয়ে আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। বিচারের অঙ্গনে কি সবুজ পতাকা উড়ছে, না লাল পতাকা উড়ছে, না কালো পতাকা উড়ছে—বুঝতে পারছি না। আমরা একটা সবুজ পতাকা দেখতে চাই। ওখান থেকে বলা হবে, জাতিকে আমরা হতাশ করব না। জাতির প্রত্যাশার আলোকে মজলুমের পাওনা তার কাছে পৌঁছে দেব।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, এই বাংলাদেশ বাংলাদেশটাকে আমরা সবাই বলি যে আসেন ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই। কিন্তু ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হলে আসলে মানসিকতায় আমাদের সবার পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তন বক্তব্যে নয়, পরিবর্তন আনতে হবে মানসিকতায়।
তিনি বলেন, অতীতকে স্মরণ রাখা ভালো, ইতিহাস শিক্ষা ভালো; কিন্তু ইতিহাসকে নিয়ে পড়ে থাকলে আমরা নিজেরাই ইতিহাস তৈরি করতে পারব না। ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে আসুন আমরা এগিয়ে যাই। আমার কথায় কেউ যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন ক্ষমা চাই। ভালো যদি কিছু বলে থাকি আল্লাহ আগে আমাকে আমল করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের সবাইকে এটা মানার তৌফিক দান করুন।
তিনি আরো বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে জড়িয়ে যারা অশ্লীল আচরণ করেছে উনি এখনও বিচার চান নাই, আমি তাঁর পক্ষে তাদের বিচার চাই। । উনার মেয়ের সম্মান মানে আমার মেয়ের সম্মান, মানে আমাদের মেয়ের সম্মান। এই ইতর প্রাণীগুলা কারা? তাদেরকে নির্মোহভাবে খুঁজে বের করা হোক। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা দুজন দাঁড়িয়ে তাদের নিরাপত্তা চেয়েছেন- আমি খুশি হতাম তারা যদি বলতেন, আমরা আমাদের নিরাপত্তা চাই না, আমরা ২০ কোটি মানুষের নিরাপত্তা চাই। আমি বলব, আমরা ২০ কোটি মানুষের নিরাপত্তা চাই।
