বিএনপি কখনোই জুলাই সনদ থেকে বিচ্যুত হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

বিএনপি কখনোই জুলাই সনদ থেকে বিচ্যুত হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সাড়ে ৯ বছরের নির্বাসন ও বিদেশের জেলখানায় কাটানো সময়গুলো তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।

ইলিয়াস আলীর মতো গুম হওয়া নেতাদের পরিবারের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের সন্তানরা আজও বাতায়ন খুলে পিতার জন্য অপেক্ষা করে। তাদের সেই অশ্রুর মর্যাদা দিতে হলে আমাদের এমন এক রাষ্ট্র গড়তে হবে যেখানে আর কোনো মানুষ গুম হবে না, কারও অধিকার হরণ করা হবে না। ২০২৬-এর এই নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি যেন বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক হয়, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শাম্স ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন, তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধা এটি এখন সংসদীয় আইনে সাব্যস্ত। এই জাতীয় ইস্যু নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করা জাতির জন্য সম্মানজনক নয়। যারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ইতিহাসের আকাশে যারা তারা হয়ে আছেন, তাদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, ২০২৪ ও ২০২৬-এর ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ফসল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ববাসী বাংলাদেশের নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কোনো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রমাণ পায়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা এই বিজয়কে খাটো করতে চান, তারা আসলে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। কোনো একক শক্তি নয়, বরং ছাত্র-জনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত অংশগ্রহণে ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে ওঠা বিতর্কের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি কখনোই জুলাই সনদ থেকে বিচ্যুত হয়নি। বরং কিছু দল নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও বিএনপি বরাবরই জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে ছিল। তিনি সংবিধানের ধারা উল্লেখ করে বলেন, অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। যেকোনো বড় সংস্কারের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি রায়ের প্রয়োজন রয়েছে বলেই বিএনপি গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিল। জাতীয় সনদ নিয়ে কোনো প্রকার বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি বিরোধীদলীয় সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদকে পাশ কাটিয়ে সরকারের করা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’- গঠনের প্রক্রিয়াকে ফ্রডোলেন্ট বা প্রতারণামূলক। জুলাই সনদের মূল দলিলের সঙ্গে বর্তমান কর্মকাণ্ডের কোনো মিল নেই এবং রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এমন আদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কীভাবে দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা এই সংসদকে অবজ্ঞা করে বাইরে ভিন্ন পন্থায় সংবিধান সংস্কারের চেষ্টা চলছে, যা দেশের আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়েই তারা নির্বাচনে ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে ২১৪ জন সদস্যের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে এসেছেন। তিনি টু-থার্ড মেজরিটি বা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই শক্তি না থাকলে অতীতে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিংবা মুক্ত গণমাধ্যম আসতো না।
তিনি বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির জন্য নাম চেয়েও পাওয়া যায়নি, অথচ বাইরে সংস্কার পরিষদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১৯শে জানুয়ারি ২০২৬-এ যখন কোনো গণভোট হয়নি, তখন কোন এখতিয়ারে ব্লু পেপারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম তৈরি করা হলো। তিনি একে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে বলেন, পদে পদে সংবিধান ভায়োলেশন করা হচ্ছে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি অচলবস্থা নিরসনে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর অধিকাংশ ধারা এখনো বিদ্যমান, যার কারণে সংবিধানে মহান আল্লাহ্র ওপর আস্থার বিষয়টি প্রতিফলিত হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন করেন, বিরোধী দল কি এখনো সেই বিতর্কিত সংশোধনীগুলোই বহাল রাখতে চায়? প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ এবং তাদের স্বার্থে একটি ভবিষ্যৎমুখী সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে অবশ্যই সংসদীয় কমিটিতে আসতে হবে। বিএনপি’র ইতিহাসকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংসদীয় রাজনীতি প্রবর্তনের ইতিহাস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বর্তমান গ্লোবাল অর্ডারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাকস্বাধীনতার নামে চলা অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন