বাংলাদেশের মানচিত্রে হাওরাঞ্চল যেন এক বিস্ময়কর জলভূমি—বর্ষায় এক বিশাল সাগর, আর শুষ্ক মৌসুমে সোনালি ধানের প্রান্তর। এই বৈপরীত্যের মাঝেই গড়ে উঠেছে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বপ্ন আর সংগ্রাম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকৃতির খামখেয়ালি আচরণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, অকাল বন্যা এবং বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ হাওরাঞ্চলকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই হাওর যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কতটা টেকসই থাকবে?
প্রতি বছর এপ্রিল-মে মাস এলেই হাওরাঞ্চলের কৃষকের বুক কাঁপতে থাকে। কারণ এই সময়েই পাকা ধান ঘরে তোলার কথা, অথচ এই সময়েই আসে উজানের পাহাড়ি ঢল আর অতি বর্ষণ। ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা ঢল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তলিয়ে দেয় হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠ।
সম্মানিত পাঠক, বুধবার বিকেলে এই কলামটি লিখতে বসেই আমার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলের খোঁজ নিতে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনকে ফোন দিলাম। ফোন তুলেই তিনি জানালেন—হাওরাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তিনি জুম মিটিংয়ে ব্যস্ত। তার কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট; লক্ষাধিক হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানালেন তিনি। এরপর কথা বললাম সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমানের সঙ্গে। তিনিও তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে ছিলেন। তিনি জানান—ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে, আরও সাত হাজার হেক্টর জমির ফসল ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে অন্তত ২০ হাজার পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনই যেন হাওরাঞ্চলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট—সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, চোখের জল আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাওরাঞ্চল মূলত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত—কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। এখানে বছরে মূলত একটিই ফসল—বোরো ধান। কিন্তু সেই এক ফসলই দেশের খাদ্য ভাণ্ডারের বড় অংশ পূরণ করে। অর্থাৎ, হাওরের প্রতিটি ধানক্ষেত শুধু কৃষকের নয়, পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণাসহ বিভিন্ন হাওরে চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ও আধাপাকা ধান। যে সময় কৃষকের ঘরে ধান তোলার কথা, সেই সময়ই আসে অকাল বন্যা। ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলে দেয় সবকিছু। মাঠ, পথ, খেত—সব একাকার হয়ে যায় পানিতে।
যে ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে, সেটিও নিরাপদ নয়। উঁচু জায়গায় রাখা ধানও পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে শুধু ফসলই নয়, খড়, বীজ, এমনকি ভবিষ্যৎ চাষের সম্ভাবনাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকের সামনে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন—এবার বাঁচবে কীভাবে? এই প্রেক্ষাপটে সরকার হাওড়বাসীর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে—যা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি মানবিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণা অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস সহায়তা প্রদান করা হবে। বুধবার সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি বাস্তব পরীক্ষা। হাওরাঞ্চলের সংকটের আরেকটি ভয়াবহ কিন্তু উপেক্ষিত দিক হলো বজ্রপাত। ফসল বাঁচাতে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে নামেন কৃষকরা, আর সেই সময় বজ্রপাত হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। প্রতিবছর অসংখ্য কৃষক প্রাণ হারান, কিন্তু এই মৃত্যুগুলো খুব কমই জাতীয় আলোচনায় স্থান পায়। অথচ এই মানুষগুলোর জীবন বাজি রেখেই দেশের খাদ্য উৎপাদন টিকে আছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বড় একটি অংশ ঋণনির্ভর। এনজিও কিংবা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তারা চাষাবাদ করেন। ফসল হারালে শুধু আয় নয়, তাদের সামনে দাঁড়ায় ঋণের বোঝা, দারিদ্র্য এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা। ফলে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্রুতই রূপ নেয় মানবিক সংকটে।
অবকাঠামোগত দুর্বলতাও এই সংকটকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিবছর আগাম বন্যা ঠেকাতে ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর অনেকই সময়মতো সম্পন্ন হয় না বা মানসম্পন্ন হয় না। সামান্য চাপেই ভেঙে পড়ে, আর পানিতে তলিয়ে যায় হাজার হাজার হেক্টর জমি। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা, পাম্প হাউসের অকার্যকারিতা এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিকীকরণের অভাব। সময়মতো ধান কাটতে না পারায় কৃষকরা দুর্যোগের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে নৌযান না থাকায় কাটা ধানও ঘরে তোলা সম্ভব হয় না। সবকিছুর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর বাস্তবতা—জলবায়ু পরিবর্তন। অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা। জলবায়ুর এই পরিবর্তন শুধু ফসল নষ্ট করছে না, কৃষকের পরিকল্পনাকেও ভেঙে দিচ্ছে। ফলে কৃষি এখন আর পূর্বানুমানযোগ্য থাকছে না।
এই পরিস্থিতি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। হাওরাঞ্চল থেকে উৎপাদিত বোরো ধান জাতীয় চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করে। যদি এই উৎপাদন বারবার ব্যাহত হয়, তাহলে বাজারে চালের সংকট দেখা দেবে, দাম বাড়বে, এবং নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং, হাওরাঞ্চলের সুরক্ষায় সরকারকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। এটি কোনো প্রান্তিক এলাকা নয়—এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তাই এখানে বিনিয়োগ, পরিকল্পনা এবং সুরক্ষা—সবকিছুতেই বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, দ্রুত পুনর্বাসন এবং বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রণোদনা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই,হাওরাঞ্চলের কৃষকরা শুধু নিজেদের জন্য চাষ করেন না—তারা পুরো দেশের খাদ্য জোগান দেন। তাদের ঘামের ফসলেই দেশের কোটি মানুষের ভাতের থালা ভরে ওঠে। তাই হাওরের প্রতিটি ডুবে যাওয়া ধানক্ষেত শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি পুরো জাতির জন্য সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনই হাওরাঞ্চল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হতে পারে। তাই হাওর বাঁচানো মানে শুধু একটি অঞ্চলের মানুষকে বাঁচানো নয়— বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার সংগ্রাম। সুতরাং এই সংগ্রামে আমাদেরকে জিততেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ইমেইল: [email protected]
