টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে তিন বাংলাদেশির লড়াই

বৃটেনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে তিন বাংলাদেশির লড়াই

ফন্ট সাইজ:

আগামী ৭ই মে অনুষ্ঠিত হবে বৃটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন। পূর্বলন্ডনের রেডব্রিজ, নিউহাম, টাওয়ার হ্যামলেটস ও বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম কাউন্সিল নিয়ে সর্বত্র বিরাজ করছে নির্বাচনী ঝড়। এই ৪টি কাউন্সিলেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। চারটি আসনে মোট ওয়ার্ড রয়েছে ৮৫টি ও কাউন্সিল আসন রয়েছে ২২৫টি। ২২৫টি আসনে ভিন্ন ভিন্ন কমিউনিটির মোট ১ হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে লড়ছেন।

তারা সবাই লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস ,অ্যাসপায়ার পার্টি, গ্রিন পার্টি, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট, টাওয়ার হ্যামলেটস্ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি থেকে ।

বাংলাদেশি অধ্যুষিত ৪টি কাউন্সিলের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলেই বাংলাদেশিদের বেশি বসবাস। ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই বাংলাদেশি দেশি -বিদেশি রাজনৈতিক, বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক কেন্দ্রস্থল টাওয়ার হ্যামলেটস। এই বারার মেয়র পদে লড়ছেন মোট ৪ জন প্রতিদ্বন্দী। এর মধ্যে হেভিওয়েট প্রার্থীরাও রয়েছেন। কাউন্সিলটিতে ২০টি ওয়ার্ডে মোট ৪৫টি আসন রয়েছে। প্রায় সবগুলো দল থেকে মোট ১২১ জন কাউন্সিলর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন।

টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিলে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী ৪ জনের মধ্যে অ্যাসপায়ার পার্টি থেকে লড়ছেন বর্তমান নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান। হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে লুৎফুর রহমানকে ধরা হচ্ছে। লুৎফুর রহমান তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।

অপর হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন লেবার পার্টি থেকে সিরাজুল ইসলাম। বৃটেনের বৃহৎ ও বর্তমান সরকারি দল লেবার। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাজনীতি করা লেবার পার্টির প্রার্থী সিরাজুল ইসলামেরও তুমুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। সমর্থক সংখ্যা অনেক। তবে অনেকে বলছেন, টাওয়ার হ্যামলেটস্ লেবার পার্টির মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফলে লেবার সমর্থকদের অনেক ভোট অন্যের ঝুড়িতে যেতে পারে বিধায় নির্বাচনে সিরাজুল ইসলামের বিজয়ী হওয়া চ্যালেঞ্জের মুখে। এরপরেও লুৎফুর রহমানের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলামকেই ধরা হচ্ছে।

আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টাওয়ার হ্যামলেটস পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার জামি আলি। জামি আলিকে নতুন প্রজন্মের আইডল বলে মনে করা হচ্ছে। জামি আলির জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন রয়েছে। তিনিও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে মেয়র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নির্বাচনী ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তাকে নিয়েও সবাই বেশ আশাবাদী।

হেভিওয়েট প্রার্থী আবদুল হান্নান তিনি লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টি থেকে নির্বাচনে মেয়র পদে লড়ছেন। তারও বেশ জনসমর্থন রয়েছে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন বর্তমান মেয়র লুৎফুর রহমান। তাকে নিয়ে ইতিবাচক -নেতিবাচক উভয় আলোচনা রয়েছে। লুৎফুর রহমান ২০১০, ২০১৪, ২০১৫ ও ২০২২ সালে সালে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হন। তবে ২০১৫ সালের নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে যা পরবর্তীতে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত তার মেয়র পদ খারিজ করে পাঁচ বছরের জন্য তাকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ওই সময় পুনঃ নির্বাচনে জন বিগস টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র হন। শেষমেশ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে লুৎফুর রহমান ২০২২ সালে মেয়র পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান এবং বিপুল ভোটে আবারও মেয়র নির্বাচিত হন।

২০২২ সালে তিনি ক্ষমতায় আসার পর কাউন্সিল ও তার দপ্তরে বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচুর আত্মীয়করণ করেছেন এমন অভিযোগ উঠে। এছাড়া বিগত পাঁচ বছরে বারার উন্নয়ন নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন রয়েছে। তবে লুৎফুর রহমানের দপ্তর বলছে, তিনি বিগত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ উন্নয়ন করেছেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের। এর মধ্যে পূর্বের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ৯৩ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া, মেয়র হিসেবে কাউন্সিলের দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল কেন্দ্রীয় সরকারের তদারকি করছে। ফলে তাকে নিয়ে দীর্ঘ সমালোচনা তৈরী হয়েছে। যা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।

পূর্ব লন্ডনের অন্যান্য কাউন্সিল থেকে যারা মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন :
রেডব্রিজ কাউন্সিল: এই কাউন্সিলে মোট ২২টি ওয়ার্ড রয়েছে। আসন সংখা ৬৩। এখানেও ভিন্ন ভিন্ন দল থেকে কাউন্সিলরসহ মোট ৫৫ জন বাংলাদেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

নিউহাম কাউন্সিল: পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এর পরই বাংলাদেশিদের জন্য নিউহাম কাউন্সিল বিখ্যাত। এখানেও অধিক সংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করেন। কাউন্সিলটিতে ২৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। এর আসন সংখ্যা মোট ৬৬টি। এতে স্বতন্ত্রসহ ভিন্ন ভিন্ন পার্টি থেকে ৮৭ জন বাংলাদেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন গ্রিন পার্টি থেকে আরিক চৌধুরী ও লেবার পার্টি থেকে ফরহাদ হোসেন।

বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম কাউন্সিল: এই কাউন্সিলের ওয়ার্ড সংখ্যা ৯টি। আসন সংখ্যা ৫১টি। এখানেও ভিন্ন ভিন্ন দল থেকে ৩৪ জন বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর পদে লড়ছেন।

বিশ্লেষক  ও ভোটাররা মনে করছেন, বৃটেনে এবারের স্থানীয় নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বংশোভূত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী বৃটিশ রাজিনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন বার্তা দেবে। বরাবরের মতোই জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এবারও বাংলাদেশি বংশোভূত বিপুল সংখ্যক কাউন্সিলর ও মেয়র প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই বিপুল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ মানে জনগণ তাদের দৈনন্দিন সমস্যা যেমন আবাসন, পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে চায়। স্থানীয় ইস্যুগুলোর পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। 

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন