বৃটেনে জব্দ সম্পদ ফেরাতে বাংলাদেশের করণীয়: অভিজ্ঞতা ও পথনির্দেশ

বৃটেনে জব্দ সম্পদ ফেরাতে বাংলাদেশের করণীয়: অভিজ্ঞতা ও পথনির্দেশ

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের সাম্প্রতিক ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশি ব্যক্তিদের ২৫ কোটি পাউন্ডেরও বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এই তথ্য একদিকে যেমন স্বস্তির, অন্যদিকে তেমনি উদ্বেগেরও। কারণ সম্পদ জব্দ হওয়া আর সম্পদ ফেরত আসা এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে আমাদের করণীয় কী এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ এ ক্ষেত্রে কী পথ অনুসরণ করেছে?

পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো: বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য পেয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা নেয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাবেক স্বৈরশাসক সানি আবাচার লুট করা প্রায় ৩০০ কোটি ডলার সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে ফেরত আনতে নাইজেরিয়া দীর্ঘ দুই দশক ধরে কূটনৈতিক ও আইনি লড়াই চালিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন — FATF, Interpol এবং UNODC-র সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশটির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল শক্তিশালী আইনি কাঠামো এবং নিরলস কূটনৈতিক তৎপরতা।

ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মার্কোস পরিবারের লুট করা সম্পদ ফেরাতে দেশটি একটি বিশেষ সংস্থা- Presidential Commission on Good Government (PCGG) গঠন করেছিল। সুইজারল্যান্ড থেকে প্রায় ৬৮ কোটি ডলার ফেরত আনতে তাদের সময় লেগেছিল প্রায় ১৫ বছর। তবে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই এই সাফল্যের ভিত্তি রচনা করেছিল।

ইউক্রেনের অভিজ্ঞতাও প্রণিধানযোগ্য। ইয়ানুকোভিচ সরকারের পতনের পর ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পদ পুনরুদ্ধার চুক্তি করে এবং একটি বিশেষ Asset Recovery Office প্রতিষ্ঠা করে। এই কার্যালয়ের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জমা থাকা সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।

পেরুর ফুজিমোরি-পরবর্তী সরকার সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার চুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তির মাধ্যমে তারা প্রায় ১৭ কোটি ডলার ফেরত আনতে সক্ষম হয়, যা পরবর্তীতে সামাজিক উন্নয়ন তহবিলে ব্যয় করা হয়।

বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ বহুমাত্রিক। প্রথমত, সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি প্রমাণ, যা সংগ্রহ করা সহজ নয়। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য দক্ষ আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞ দল প্রয়োজন, যার ঘাটতি আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। তৃতীয়ত, এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে। ফলে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের করণীয়

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, একটি বিশেষ সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইন মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ দল গঠন করা জরুরি। ফিলিপাইন ও ইউক্রেনের মতো এই দলকে আইনি ক্ষমতা ও পর্যাপ্ত বাজেট দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে হবে। যুক্তরাজ্যে মামলা পরিচালনার জন্য লন্ডনভিত্তিক অভিজ্ঞ আইনি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া অত্যাবশ্যক। নাইজেরিয়া ও পেরু এই পথেই সাফল্য পেয়েছে।

তৃতীয়ত, লন্ডনের 'ইলিসিট ফিন্যান্স সামিট'-এ সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে অংশ নিতে হবে। এই সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল সুযোগ। শুধু অংশগ্রহণ নয়, সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও তথ্য-উপাত্ত নিয়ে যেতে হবে।

চতুর্থত, দ্বিপক্ষীয় সম্পদ পুনরুদ্ধার চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক এমএলএটি(Mutual Legal Assistance Treaty) বা বিশেষ সম্পদ পুনরুদ্ধার চুক্তি করা গেলে প্রক্রিয়া অনেক সহজ হবে।

পঞ্চমত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ফেরত আসা অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, তার একটি স্বচ্ছ কাঠামো আগেই তৈরি করতে হবে যাতে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায়। সারাহ কুকের ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশার আলো দেখিয়েছে। কিন্তু আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি বাস্তববাদী হওয়াও জরুরি। পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতায় সম্ভব নয় এর জন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয় ইচ্ছাশক্তি ও কৌশল থাকলে এই লড়াইয়ে জেতা সম্ভব। বাংলাদেশকে এখনই সেই পথে হাঁটতে হবে, কারণ প্রতিটি বিলম্বই এই অর্থ ফেরার সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করে দেয়।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি

ইমেইল: [email protected]

নদী

২ মাস আগে

বৃটেনে জব্দ সম্পদ ফেরাতে বাংলাদেশের করণীয়: অভিজ্ঞতা ও পথনির্দেশ : অর্থ ফেরানোর জন্য রাষ্ট্রের কাউকে না পাঠানো ভালো,এক জায়গা থেকে বসে বসে যোগাযোগ করা যায়,যখন রেডি হবে ব্যাংক একাউন্ট দিলে অর্থ চলে আসবে,১০ জন দুর্নীতিবাজ পাঠানোর কোন দরকার নাই।

মন্তব্য করুন