কার্পেটে কারসাজি: সিলেটে ব্যবসায়ী জুয়েল ‘কাঠগড়ায়’

ফন্ট সাইজ:

সিলেটের কার্পেট ব্যবসায়ী জুয়েল আহমদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে কার্পেট বিক্রির অভিযোগ তুলেছেন অপর ব্যবসায়ীরা। বলেন, তুর্কির কার্পেট, অথচ তিনি সরবরাহ করেন দেশের তৈরি কার্পেট। স্টিকার লাগিয়ে এ ধরনের প্রতারণা করে যাচ্ছেন। ২০২৪ সালে জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকা কালেক্টরেট জামে মসজিদে একই ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে জানাজানি হয়। এদিকে ব্যবসার নামে জুয়েলের অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরে এবং নামে-বেনামে থাকা বিশাল সম্পত্তির বিষয়টি জানিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন নগরের চার কার্পেট ব্যবসায়ী। প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে- অভিযোগ পাওয়ার পর এ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাতারা হচ্ছেন নগরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মার্কেটের ব্যবসায়ী হাকিম রব্বানী চৌধুরী, লালদীঘিরপাড়ের ব্যবসায়ী নুর উদ্দিন, মহাজনপট্টির ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাবুল, সিলেট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মার্কেটের ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- ২০২৪ সালে সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সময় প্রায় ৪ লাখ টাকার তুর্কি প্রস্তুত করা কার্পেট ক্রয় আহ্বান করা হয়। ওই সময় ব্যবসায়ী জুয়েল আহমদসহ কয়েকজন এতে অংশ নিলে সবচেয়ে কম মূল্যে ওই কার্পেট সরবরাহ করেন জুয়েল আহমদ। ওই সময় কার্পেট নিয়ে সন্দেহ হয় ব্যবসায়ীদের। এ নিয়ে তারা অভিযোগ তুলেন। পরে খবর নিয়ে জানা যায়, ফরিদপুর জেলার মামুন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আর, এম কার্পেট লি. কোম্পানির উৎপাদিত ১৮০০ টাকা ক্রয় মূল্যে প্রতি গজের ক্রিস্টাল কোয়ালিটির কার্পেটকে ‘তুর্কি’ (আল-রিহা) স্টিকার লাগিয়ে প্রতি গজ ৩২০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে।

জালিয়াতের মাধ্যমে অঢেল সম্পদের অধিকারী হওয়া জুয়েলের মূল বাড়ি হচ্ছে ঢাকার বিক্রমপুর। অনেক আগে থেকে সে সিলেট নগরে বসবাস করে। বর্তমানে পাঠানটুলা এলাকার মোহনা ব্লক এ ১৪/১ নম্বরে তার বাসা। দুদকে দেয়া আবেদনে ওই চার ব্যবসায়ী উল্লেখ করেন- বন্দরবাজার ও লালদীঘিরপাড় এলাকায় মসজিদের নামাজের কার্পেট ব্যবসার আড়ালে এক ভয়াবহ জালিয়াতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মহোৎসব চালাচ্ছেন জুয়েল আহমদ। জুয়েল তার প্রতিষ্ঠান আল মদিনা বস্ত্র বিতান এবং আল মদিনা কার্পেট হাউজ’র মাধ্যমে বাংলাদেশে উৎপাদিত কার্পেটে তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও বেলজিয়ামের জাল স্টিকার লাগিয়ে তা বিদেশি পণ্য হিসেবে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করছেন। এক সময়ের সাধারণ রিকশা গ্যারেজ মালিক থেকে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি বিপুল পরিমাণ টাকা ও সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত সম্পদের মধ্যে রয়েছে বন্দর বাজার পত্রিকা পয়েন্টে স্বাদ অ্যান্ড কোম্পানির ২য় তলায় থান কাপড়ের শোরুম, কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মার্কেটে দুটি কার্পেটের দোকান, লালদীঘিরপাড় মেইন রোডে একটি কার্পেটের শোরুম ও মহাজনপট্টির আলী কমপ্লেক্স মার্কেটে ৬ শতক জায়গার মধ্যে শোরুম ও গোডাউন।

এ ছাড়া মহাজনপট্টিতে আলী কমপ্লেক্স মার্কেটে অদ্য ক্রয়কৃত নির্মাণাধীন ৬ শতক জমির উপর ৩ তলা ফাউন্ডেশনের গোডাউন, জিন্দাবাজার সিলেট প্লাজা মার্কেটে নিচতলায় ডি ৪ ও ৫ নং দোকানসহ মোট ৩টি দোকান ও লালদীঘিরপাড় নতুন মার্কেটে ব্লক বি, দোকান নং ৩৪ ও ৩৫ সহ মোট ৫টি দোকান রয়েছে। ব্যবসায় জালিয়াতি করে এয়ারপোর্টের লাখাউড়া এলাকা ১০ বিঘা ভূমি এবং লাখাউড়া বাজার মসজিদ সংলগ্ন ১৩ শতক ভূমি কিনেছেন। পাঠানটুলা রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল সংলগ্ন ১ কোটি টাকা মূল্যের ৪ শতক ভূমি। সিলেট সিটি করপোরেশনের ৮নং ওয়ার্ডে দর্জি পাড়ায় ২০২৪-২৫ সালে ক্রয় করা ১০ শতক ভূমির উপর টিনশেডের বাড়ি ও ৫ শতক ভূমি রয়েছে তার। এর বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। ঢাকার মাওয়া ও পদ্মা রোডসহ বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে বিপুল ভূ-সম্পত্তি রয়েছে। বিপুল পরিমাণ ব্যবসার লেনদেন থাকা সত্ত্বেও তিনি যথাযথ সরকারি ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রদান না করে সরকারকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছেন। নগরের বন্দরবাজার শাখার পূবালী ব্যাংকসহ কয়েক ব্যাংকের শাখায় তার বিপুল পরিমাণ টাকা রক্ষিত আছে বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।

অভিযোগ তুলে ধরে তারা জেলা প্রশাসক ও দুদকের সঠিক তদন্ত ও পরবর্তী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। অভিযোগকারী ব্যবসায়ী হাকিম রব্বানী চৌধুরী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আমরা কার্পেট ব্যবসায়ীরা সবসময় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কার্পেট বিক্রি করি। জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকা মসজিদে জুয়েল যে কার্পেট বিক্রি করেছিল সেটি তুর্কির নয়, দেশের তৈরি কার্পেট। বিষয়টি আমরা জানার পর জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানিয়েছি। এভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে তিনি ঠকিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়টি আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্য লজ্জাজনক।

তিনি বলেন- অবৈধভাবে ব্যবসা করা ছাড়া সিলেটে সে কম সময়ে এত টাকার মালিক হতে পারতো না। আমরা যে অভিযোগ দিয়েছি সেগুলো দৃশ্যমান। সবাই তার সম্পদ সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। এ ব্যাপারে জুয়েল আহমদ জানিয়েছেন- তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে সব মিথ্যা ও বানোয়াট। ব্যবসায় তিনি কারসাজি করছেন না। বরং কথামতো কার্পেট তিনি সরবরাহ করেন। তিনি বলেন- প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগের মাধ্যমে অপপ্রচার করছেন।
প্রশাসন তদন্ত করলে সব পাবে বলে জানান তিনি।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন