জাতীয় সংসদে ভোলা-১ সদর আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থের বক্তব্যকে কেন্দ্রে করে উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে। তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। আন্দালিভ রহমান পার্থের বক্তব্যের সময় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে হট্টগোল করেন এবং প্রতিবাদ জানান তারা। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় এই উত্তাপ সৃষ্টি হয়। সংসদে আন্দালিভ রহমান পার্থ তার বক্তব্যে বলেন, বিরোধী দলীয় নেতারা বলেছেন- জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার কথা। এরপরই সংসদে হট্টগোল শুরু হয়।
বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও তার জোটের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করেন পার্থ। তিনি একে ‘দ্বিমুখী আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, জিয়া পরিবারকে নিয়ে কটূক্তি করা কিংবা রাজপথে আন্দোলনের ডাক দিয়ে আবার সংসদে ভিন্ন সুরে কথা বলা রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। আওয়ামী লীগ সরাতে ১৭ বছর লাগলেও বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে ১৬ দিনও সময় লাগবে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রবাসীদের ও গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য সংসদের উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে ব্যাংক লুট ও অর্থনৈতিক অপরাধের লাগাম টানতে ‘ইকোনমিক ট্রিজন’ বা অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা আইন পাশের জোর দাবি জানান তিনি।
পার্থ বলেন, বর্তমানে কেন তরুণ সমাজ বারবার কেবল জুলাইয়ের ৩৬ দিনের গণঅভ্যুত্থানের কথাই বলে, তার কারণ আমাদের অনুধাবন করতে হবে। ২০০৮ থেকে গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছে, তা আমরা তরুণদের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারিনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান অনেক সংসদ সদস্যের বয়স যখন মাত্র ১০ বছর ছিল, তখন শেয়ারবাজারের দরবেশের কবলে পড়ে ৩০ লাখ মানুষ ফকির হয়েছে। বিডিআর পিলখানা হত্যাকাণ্ড কিংবা শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের যেভাবে অপমান করা হয়েছে, সেই ক্ষতগুলো আজকের প্রজন্ম হয়তো সেভাবে ফিল করে না। ইয়াবাসম্রাট বদি কিংবা মমতাজের মতো ব্যক্তিদের এই পবিত্র সংসদে বসিয়ে সংসদকে কলঙ্কিত করা হয়েছিল, যা তরুণদের জানানো অত্যন্ত জরুরি।
আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, অনেকে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে কথা বলে। জুলাইকে অস্বীকার করে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ নেই। জুলাইকে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ নেই। এ বিচার না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, আমরা ১৯৪৭ কে অবশ্যই সম্মান করি। কিন্তু ১৯৭১ আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের অর্জন, আমাদের গৌরব। এটার সাথে কারো তুলনা চলবে না। ১৯৭১ এর প্রসঙ্গ যখন আসবে তখন আমাদের বিরোধী দলের ভূমিকা আসবে। ৪৭, ৫২, ৭১ এক না। প্রত্যেকটির সৌন্দর্য আলাদা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন- জাতিকে বিভক্ত করা যাবে না। সেটা হিন্দু-মুসলমানে জাতিকে বিভক্ত করা যাবে না। কিন্তু আমরা কি হাওয়ার সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি? রাজাকারদের সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। তাই এ আলোচনা সব সময় আসবে।
পরে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি পড়েছি মসিবতে মাননীয় স্পিকার। সবাই আমাকে ভালোবাসে তো, তাই আমাকে নিয়ে সবাই কৌতুক করে। আমি শুনেছি আমাদের পার্থ সাহেব খুব ভালো ডিবেট করতেন। তিনি প্রচুর ম্যাটেরিয়ালস নিয়ে এসেছেন। তিনি কিছু সঠিক বক্তব্য দিয়েছেন, আবার কিছু বেঠিক বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি বলেন, তিনি (পার্থ) বলেছেন, জিয়া পরিবারকে নিশ্চিহ্ন কিংবা হাবিজাবি করতে বলেছি। আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি-কোথায়, কখন এবং কীভাবে তিনি এটি পরিষ্কার করবেন। আমি এ ধরনের রেকলেস কথা বলি না। এমনকি শেখ হাসিনার নামেও আমি বলি না। যে দোষ করবে, সেই তার দায় নেবে। অন্য কেউ বললে সেটি আমার নামে চালানো যাবে না। আমি তাকে অনুরোধ করছি, বক্তব্যে মাধুর্য ছড়াতে গিয়ে ভবিষ্যতে যেন আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের মন্তব্য না করেন।
এই বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, এই যে আমার হাতে ডকুমেন্টস আছে, ‘জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার কথা এনসিপির এক নেতা বলেছেন।’
এরপর আবার হট্টগোল শুরু হলে পার্থ বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, এত উত্তেজিত হবেন না। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, সম্মানিত সংসদ সদস্যরা দয়া করে আপনাদের আসন গ্রহণ করুন। দয়া করে স্পিকারকে কথা বলতে দিন। তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্য বক্তব্য রাখছেন। আপনি এটি পছন্দ করতেও পারেন আবার নাও করতে পারেন, কিন্তু আপনার কোনো অধিকার নেই এভাবে কথা বলার। বিরতির আগে স্পিকার বলেছেন, প্রত্যেকের স্বাধীনতা আছে। স্পিকারের অনুমতি সাপেক্ষে আপনাদের কথা বলার অধিকার রয়েছে। কিন্তু একজন আরেকজনকে এভাবে আক্রমণ করার অধিকার নেই।
পরে পার্থ বলেন, আমরা তো এখানে এ বছরের জন্য আসিনি, অনেক সময়ের জন্য এসেছি। আমরা একসঙ্গে রাজনীতি করি। তিনি ১১ দলীয় নেতা, তাই হয়তো তার নাম ধরেই শুরু করেছি। এই ক্লিপগুলোতে আরও অন্যান্য কথা রয়েছে, এজন্য আমি ব্যাখ্যা করিনি। কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকলে আমার কোনো সমস্যা নেই। তবে আমাকে (বিরোধী দলীয় নেতা) অভিযুক্ত করা ভুল বোঝাবুঝি। এটি সাধারণ বিষয়।
জবাবে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আমি শুধু বলেছি, এই ফ্লোরে দাঁড়িয়ে কোনো ডকুমেন্টস বা রেফারেন্স দিলে তা অবশ্যই পরিষ্কার হতে হবে। তাহলে কোনো সমস্যা হয় না। তখন কারো চ্যালেঞ্জ থাকলে করতে পারে।
