আলোর মুখ দেখবে কি?

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলস

আলোর মুখ দেখবে কি?

ফন্ট সাইজ:

ক্ষতবিক্ষত কঙ্কালসার দেহ নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ানী টেক্সটাইল মিল এর চারদিক শুধু ঝোপঝাড় আর পোকামাকড়ের আখড়া। রাত হলেই ভবঘুরে, মাদকসেবী আর নানা রকম অসামাজিক কার্যকলাপের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়া দেশের ২য় বৃহত্তম এবং লাভজনক দারোয়ানী টেক্সটাইল মিল আবার সরব হয়ে উঠবে এমন খবরে মিল এলাকায় চাঞ্চল্যতা দেখা দিয়েছে। যে মিল একসময় শত শত কর্মকর্তা আর কর্মচারীর পদভারে মুখর থাকতো সেই দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলের চারদিকে এখন শুধুই সুনসান নীরবতা আর লুটপাটের চিহ্ন। নীলফামারী জেলার একমাত্র শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশ সেরা খ্যাতি আর উৎপাদিত সুতার মান এতটাই উন্নত ছিল যে, সুতা ক্রয়ের জন্য ব্যবসায়ীরা রীতিমতো হুড়োহুড়ি করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেন।

বিগত সরকারগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সুতার দর নির্ণয়, শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া-আন্দোলনের সঙ্গে ভারতীয় নিম্নমানের সুতা আমদানি কাল হয়ে দাঁড়ায় দেশের টেক্সটাইল খাত। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাতক্ষীরা সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলের পর দেশের ২য় লাভজনক দারোয়ানী টেক্সটাইল মিল লোকসানের মুখে পড়ে। বছর কয়েকের মধ্যেই দেশসেরা সুতা গলার কাঁটা হয়ে দেখা দেয় কর্তৃপক্ষের। লোকসানের বোঝা বাড়তে থাকায় শুরু হয় নানামুখী জটিলতা। ২৬ হাজার টাকু বিশিষ্ট দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলটি যেন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। লোকসানের বোঝা কমাতে গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই করেও যখন লাভের মুখ দেখা যাচ্ছিল না, তখন সার্ভিজ চার্জের আওতায় দেয়া হয় মিলটি। বেশ কয়েক বছর দফায় দফায় সার্ভিজ চার্জের আওতায় দিয়েও মিলটির শেষ রক্ষা হয়নি। বন্ধ হয়ে যায় লাভজনক ও সম্ভাবনাময় মিলটি।

বন্ধ হয়ে যায় প্রায় দেড় হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকায় জাপান হাওয়াই কোম্পানির মূল্যবান যন্ত্রাংশগুলো বিভিন্ন ভাবে খোয়া যেতে শুরু করে। আজ এটা নেইতো কাল ওটা নেই। বেড়ায় খেত খাওয়ার মতো অবস্থা। ১৯৭৭ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত মিলটির চূড়ান্ত বিলুপ্তি ঘটে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের জামানায়। স্থানীয়রা জানায়, চুরিচামারি লুটপাট থেকে বেঁচে যাওয়া যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য মালামাল বিটিএমসি কর্তৃপক্ষ লোক দেখানো নিলামের মাধ্যমে সব বিক্রি করে দেয়। এরপর থেকে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে মিলের মূল ভবন, স্টোর রুম, অফিস ও আবাসিক ভবনগুলো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলেও ভবনের দরজা-জানালা খুলে নিয়ে গেছে কে বা কারা। যদিওবা জরাজীর্ণ মিল এলাকা পাহারায় রয়েছেন, কয়েকজন আনছার। জানা যায়, দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলসহ আরও কয়েকটি মিল একত্রে দেখভাল করার জন্য রয়েছেন একজন ব্যবস্থাপকও। যদিও তিনি এখানে থাকেন না।

সুসময়ে মিলে কর্মরত শ্রমিক গুলজার রহমান ও মোশাররফ হোসেন জানান, লাভজনক মিলটি ধ্বংসের পেছনে বিটিএমসি’র তৎকালীন দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত। দেশীয় সুতার দর বৃদ্ধি করে ভারতীয় নিম্নমানের সুতা কম দামে বাজারে আসার সুযোগ করে দিয়ে তারাই মিলগুলো বন্ধের চূড়ান্ত বন্দোবস্ত করেন। এদিকে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে স্থানীয় সংসদ সদস্য এড. আল ফারুক আব্দুল লতীফ বন্ধ দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলের বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে আনলে গত ১২ই এপ্রিল বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম মিল পরিদর্শনে আসেন। এ সময় তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী ২-৩ মাসের মধ্যেই দারোয়ানী টেক্সটাইল মিল চালু করা হবে বলে আশার বাণী শোনান। তবে স্থানীয়দের ধারণা, তা কখনই সম্ভব নয়।

কারণ, নাট-বল্টু-কলকব্জাবিহীন জরাজীর্ণ ভবনে কীভাবে মিলটি এত দ্রুত সময়ের মধ্যে চালু করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে অপর একটি সূত্র জানায়, মিলের জরাজীর্ণ ভবন কোনো কোম্পানির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা হতে পারে। তাতেও সময় লাগবে অন্তত দেড় থেকে দুই বছর। মিলটি চালু হচ্ছে এমন খবরে এলাকায় যেমন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে তেমনি, কর্মসংস্থানের আশায় বুক বাঁধছেন হাজারো মানুষ।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন