সড়ক-মহাসড়কে ডাকাতিসহ সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী যানবাহন ও যাত্রীরা পড়ছেন সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের কবলে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও ব্যক্তিগত যানবাহন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও অভিযানের পরও থামছে না এই অপরাধ।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছরের তিন মাস (জানুয়ারি থেকে মার্চ) পর্যন্ত সড়ক-মহাসড়ক ও বাসাবাড়িতে ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৩৩টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৫২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি এবং মার্চে ৩৯টি। তার মধ্যে এই তিন মাসে শুধু ঢাকাতেই ১৩টি ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া, দস্যুতার মামলা হয়েছে ৪৩৯টি। ঢাকায় দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে ৫৩টি। এ ছাড়া, তিন মাসে নানাবিধ অপরাধে মামলা হয়েছে ৪১ হাজার ৯৯০টি। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে মহাসড়ক ও বাসাবাড়ি মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৪৪১টি ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ডাকাতির ঘটনায় ৬৩৮টি এবং দস্যুতার ঘটনায় এক হাজার ৮০৩টি মামলা হয়েছে। একই বছর সারা দেশের মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জনের একটি তালিকা করেছে হাইওয়ে পুলিশ। ২০০৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২০ বছরে মহাসড়কে ডাকাতির বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা এ তালিকায় রয়েছে। র্যাবের তথ্য মতে, গত ৯০ দিনে ১০৬ জন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
১০ই এপ্রিল দেশে ফিরেই মহাসড়কে সংঘবদ্ধ ডাকাতির শিকার হয়েছেন বোরহানউদ্দিন নামে এক প্রবাসী। এদিন ভোরে নারায়ণগঞ্জের এশিয়ান হাইওয়ে সড়কে ডাকাতির এই ঘটনা ঘটে। এ সময় ডাকাতদল ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, নগদ অর্থ, পাসপোর্টসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
গত ২৯শে মার্চে নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা ব্যারেজ-জলঢাকা মহাসড়কে ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতের আঁধারে মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী শতাধিক ট্রাক ও মাইক্রোবাসের গতিরোধ করে চালক ও যাত্রীদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে ৩৫টি মোবাইল ফোন এবং নগদ প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা লুট করে নেয়। এ সময় কয়েকটি গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর ও কয়েকজনকে মারধর করে ডাকাত দলের সদস্যরা। এই ঘটনার একদিন পর ৩১শে মার্চ রাতে নওগাঁ জেলার পোরশা থানার সরাইগাছী-খাট্টাপাড়া সড়কের ফকিরের মোড়সংলগ্ন একটি সেতুর ওপর রশি টানিয়ে সড়ক অবরোধ করে ডাকাতরা। এ সময় মোটরসাইকেলে করে যাওয়া তিনজন আরোহী ডাকাতদের কবলে পড়েন। বেশ কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে থাকা আরও তিনজনকে একইভাবে জিম্মি করা হয়। পরবর্তীতে তাদের পাশের একটি বাগানে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়। এ সময় ডাকাতরা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নগদ টাকা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। সম্প্রতি র্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, র্যাব প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। হত্যাকারী, চাঁদাবাজ, ডাকাত, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র গোলাবারুদ, মাদকদ্রব্য উদ্ধার, ছিনতাইকারী, অপহরণ, প্রতারক ও বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর এবং আলোচিত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অপারেশনস-উত্তর) মো. রফিকুল হাসান গণি বলেন, সম্প্রতি ডাকাতির কয়েকটি ঘটনা আমাদের নজরে এসেছে। আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, হাইওয়ে পুলিশের জনবল ও উপকরণে ঘাটতি রয়েছে বলে তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে। এই ঘাটতিগুলো পূরণ না হলে, সড়ক-মহাসড়ক নিরাপদ না করা গেলে মানুষকে যেকোনো সময় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে মনিটরিং ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকার বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন এবং বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। যেকোনো অপরাধীর ক্ষেত্রে যেন বিচার বিলম্বিত না হয় সেদিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে। অপরাধের বিচার যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা না যায়, তবে অপরাধ মনস্ক ব্যক্তি বা অপরাধীদের মধ্যে কোনো সতর্কতা তৈরি হয় না।
