যশোর-কালীগঞ্জ মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। সড়ক বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লি.-এর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ব্যাপক সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ হওয়ার পথে। অর্থ লগ্নিকারী দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে বরাদ্দকৃত প্রায় ১৯০০ কোটি টাকা ছাড় না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে কাজ না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লি.-এর এমডি বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে চম্পট দিয়েছে। এ কারণে দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সাফ জবাব প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ৩০ মাস পার হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ২ শতাংশের মতো। বাকি ৯৮ শতাংশ কাজের জন্য মেয়াদ আছে আর মাত্র ৪ মাস। যা কোনোক্রমেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ফলে উক্ত প্রকল্পে আর কোনো অর্থ ছাড় না করতে দাতা সংস্থা সড়ক বিভাগকে লিখিত নোটিশ প্রদান করেছে। এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সড়ক উন্নয়নের কাজ শেষ করতে না পারায় দাতা সংস্থা এই প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়ায় বিপুল সম্ভাবনাময় এই সড়কের ৬ লেনে উন্নীতকরণের কাজে বিরাজ করছে চরম স্থবিরতা।
জানা গেছে, ঝিনাইদহ শহরের বাইপাস সড়ক থেকে যশোর শহরের চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত ৪৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার সড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণের জন্য উই কেয়ার প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক বিভাগ। প্রকল্পের পক্ষ থেকে এই সড়কটিকে ৩ গ্রুপে বিভক্ত করা হয়। প্রথম গ্রুপে ঝিনাইদহ বাইপাস থেকে কালীগঞ্জ উপজেলা মোড় পর্যন্ত, দ্বিতীয় গ্রুপে কালীগঞ্জ উপজেলা মোড় থেকে বারোবাজার মান্দারতলা এবং তৃতীয় অংশে মান্দারতলা থেকে চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত বিভক্ত করে উই কেয়ার প্রকল্পের কর্তৃপক্ষ। ৬ লেন সড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই রাস্তার উভয় পাশের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী শত শত রেইন্ট্রি কড়াই, মেহগনিসহ মূল্যবান কাঠের সব প্রাচীন গাছগুলো উভয় জেলার জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করে রাস্তাটি ফাঁকা করে। একইসঙ্গে শুরু হয় জমি অধিগ্রহণের কাজ। ২০১৮ সালের শেষের দিকে প্রকল্পের পক্ষ থেকে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ইজিবি টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে দেশের স্বনামধন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের আবেদন যাচাই বাছাই শেষে ২০২৩ সালের ২৩শে অক্টোবর সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স গ্রুপকে ১নং লট এবং আব্দুল মোনেম লি.কে যথাক্রমে ২ ও ৩ লটের কাজের ওয়ার্ক অর্ডার প্রদান করে উই কেয়ার কর্তৃপক্ষ। যে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের কাজ তদারকির জন্য ঝিনাইদহ এবং যশোরে দু’টি পৃথক অস্থায়ী প্রকল্প অফিসও ভাড়া নেয়া হয়। কিন্তু অদ্যাবধি লট-২ ও লট-৩ এর কাজ যে তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে আছে। আর লট-১ এর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
কারণ হিসেবে জানা গেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লি. (এএমএল) লট-২ ও লট-৩ এর কাজ শুরুর কথা বলে উই কেয়ার প্রজেক্ট থেকে প্রাথমিক ভাবে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করলেও সাইড অফিসে কোনো টাকা তারা বরাদ্দ করেনি। এ কারণে প্রকল্প সাইডে দৃশ্যমান কোনো কাজ না হওয়ায় দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষ উক্ত ৬ লেন প্রকল্পের লট-২ ও লট-৩ এর অর্থ নগদায়ন স্থগিত করে গত ডিসেম্বরে। যার কারণে কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার মান্দারতলা থেকে যশোর শহরের চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত ৩১ দশমিক ৭ কিলোমিটার রাস্তার উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এই বিস্তীর্ণ রাস্তাটি জনচলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন অত্রাঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের স্টেক হোল্ডারগণ। এ ব্যাপারে যশোর সড়ক পরিবহন শ্রমিক সমিতি ২২৭-এর সভাপতি মামুনুর রশীদ বাচ্চু বলেন, ৬ লেন প্রকল্পের নামে এই সড়কে চলছে হরিলুটের খেলা।
সড়ক বিভাগ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গোপন চুক্তির কারণে বছরের পর বছর এই সড়ক উন্নয়নের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে আছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বেনাপোল ও ভোমরা স্থল বন্দর এবং মোংলা পোর্ট ও নওয়াপাড়া নৌবন্দরের সঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলের একমাত্র সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম এই সড়কটি বছরের পর বছর অবহেলা আর অযত্নে পড়ে থাকার কারণে যান চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তারপর সামনে বর্ষা মৌসুম। ফলে এই সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা। প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ পথচারীসহ পরিবহন সেক্টরের শ্রমিকদের।
এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও লিটন ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী আনিছুর রহমান লিটন বলেন, গত ৩/৪ বছরে এই সড়কের প্রায় শতাধিক দুর্ঘটনায় কয়েকশ’ পথচারী ও পরিবহন শ্রমিকদের জীবন গেছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এই সড়ক ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আমাদের পরিবহন বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লি.-এর লট-২ এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মঞ্জুর হাসান বলেন, বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ল্যান্ড রিকুইজিশন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হয়নি। ৩ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ৩০শে জুন শেষ হওয়ার কথা। গত তিন বছরে এই প্রকল্পের মাত্র ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কাজ হয়েছে। যা দেখে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষ উষ্মা প্রকাশ করে ফান্ড ছাড় স্থগিত করেছে। আশা করছি, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দাতা সংস্থার সঙ্গে দরকষাকষি করে ফান্ড রিপ্লেসের মাধ্যমে নতুন করে কাজ শুরু করা যাবে।
এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উই কেয়ার প্রজেক্টের লট-২ এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার তুহিন হোসেন এবং লট-৩ এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার নাকিবুল বারী বলেন, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কিছু দুর্বলতার কারণে এই প্রকল্পের কাজটি ঝুলে গেছে। যা দেখে বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষ ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রকল্পের অর্থ ছাড় স্থগিত করেছেন। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ ২ শতাংশও শেষ হবে না। তবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এই সড়কটি যান চলাচলের উপযুক্ত করতে নিজস্ব ফান্ডে সংস্কার কাজ দ্রুতই শুরু করা হবে। বিষয়টি সড়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধান প্রকৌশলীর মেইন প্রায়োডি বেসিস প্রকল্পের মধ্যেই আছে। সড়ক ব্যবহারকারী বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের অসুবিধা দূর করতে আমরা দ্রুতই রাস্তাটি সংস্কার শুরু করবো বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
