পাগল

পাগল

ফন্ট সাইজ:

ইছাপুরা বাজারটি তিন-চার বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। দূর-দূরান্তের ক্রেতা-বিক্রেতারা এই হাটে এসে সওদাপাতি ক্রয় এবং বিক্রয় করে থাকে। অনেক বছর আগে দূরের একটি হাটে সওদাপাতি ক্রয়-বিক্রয় করার জন্য গেলে ঐ গ্রামের লোকজনের সঙ্গে ইছাপুরা গ্রামের লোকজনের ঝগড়াঝাটির কারণে ইছাপুরা গ্রামবাসী মিয়াবাড়ির বড় মিয়াকে বললে, মিয়াবাড়ির চৌধুরী পরিবার, গাজী পরিবার এবং সরকার পরিবার তিন-চার বিঘা জমি হাটের নামে দান করে দেন। তা প্রায় দুইশ’ বছর আগের কথা। সেই থেকে আজ অবধি হাটটির অনেক উন্নতি হয়েছে। পোস্ট অফিস হয়েছে, পুলিশ ফাঁড়ি হয়েছে, একটি মসজিদও হয়েছে। হাটবারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে আধা মাইল দূর থেকেও গমগম শব্দ শোনা যায়। ইছাপুরা বাজার জামে মসজিদের ইমাম লালচাঁন মুন্সী বেশির ভাগ সময় হাটেই সময় কাটান।

হাটের দিন সওদাপাতি করেন। সকাল ১০টার দিকেই হাট জমে ওঠে। ২টার দিকেই হাট ভেঙে যায়। বুধবার ও রোববার দু’টি দিন হাট বসে। এই দু’টি দিনই সওদাপাতি ক্রয় করেন তিনি। সকালের দিকে তিনি ঝাঁকায় করে আনা কতোগুলো ফুলকপির মধ্য থেকে একটা বড় ফুলকপি চয়েস করে ফুলকপির ব্যাপারীকে বললেন, ‘ব্যাপারী, তোমার ফুলকপিগুলো তো খুবই সুন্দর। এত বড় ফুলকপি সচরাচর চোখে পড়ে না। একেকটার ওজন প্রায় তিন কেজির বেশি হবে। তা মিয়া, তোমার এই ফুলকপির দাম কতো? ব্যাপারী বললো, ‘আপনি হুজুর মানুষ, আপনার সঙ্গে দামাদামি নাই, আপনি খুশি হয়ে যা দিবেন, তাই নেবো। লালচাঁন মুন্সী বললেন, ব্যাপারী, তুমি বললে ভালো হয় না?’ ব্যাপারী বললো, ‘না হুজুর আপনার কাছে আমি দাম চাইবো না। লালচাঁন মুন্সী বললো, ‘তাহলে তোমাকে চল্লিশ টাকা দিবো।’ ব্যাপারী বললো, ঠিক আছে আপনি যা-ই দিবেন-তাই নেবো। আপনার সঙ্গে দামাদামি করা বেয়াদবির শামিল। ব্যাপারী টাকা নিয়ে হুজুরের ব্যাগে ফুলকপিটি ভরে দিলেন। হুজুর ফুলকপি নিয়ে অন্য সদাই করতে যাবার পথেই দেখলেন বাজারে নতুন আসা ছালা পরা এক পাগলকে।

পাগল হুজুরকে দেখে সালাম দিলো। পাগলের সালামের উত্তর দিয়ে হুজুর পাগলকে বললো, “দেশে কী কাপড়ের অভাব হইছে? ছালা পইরা রইছোস? ভণ্ডামি ছাড়। চল, তোরে একটা লুঙ্গি কিইনা দেই।” এই বলে পাগলের গলায় তার হাতের অংশে ধরা বেতের লাঠিটা ঠেকিয়ে টানতে টানতে কাপড়ের দোকানে নিয়ে গেলেন। হুজুরকে দেখে দোকানি দাঁড়িয়ে গেলেন। হুজুরকে সালাম দিয়ে বললেন- হুজুর আপনার কী লাগবে? হুজুর বললেন, ‘ওরে একটা লুঙ্গি দাও’। দোকানি একটি সস্তা দামের লুঙ্গি পাগলের হাতে ধরিয়ে দিলো। হুজুর বললো, ‘ছালা খুইল্যা এইটা পরো। আর ছালা পরবা না।’ পাগল ছালাটি খুলে লুঙ্গিটি পরে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। হুজুর বললো, ‘এই শুনো, ছালাটা দূরে নিয়ে ফেলে দাও।’ পাগলটি ছালাটি নিয়ে চলে গেল। হুজুর দোকানিকে টাকা দিয়ে অন্য সদাই করতে চলে গেলেন।

দশ-বারো দিন পর হুজুরের সঙ্গে পাগলটির আবার দেখা হয়ে গেল। হুজুর দেখলো পাগলটি একটা ছালা পরে আছে। তার হাতে একটা লুঙ্গি। পাগলটি এগিয়ে এসে হুজুরকে বললো, ‘হুজুর আপনার লুঙ্গিটা নিন। এই লুঙ্গির মধ্যে চোর চোর গন্ধ। এটা পরলে আমার উশখুশ লাগে। আমি শান্তি পাই না। তাই আমি লুঙ্গিটা খুলে ফেলেছি। আপনি এই লুঙ্গিটা কাউকে দিয়ে দেন। আমি এক চালের দোকানির কাছ থেকে ছালাটি চেয়ে নিয়েছি। এটা পরলে শান্তি লাগে, উশখুশ লাগে না।’ পাগলের কথা শুনে হুজুর থতমত খেয়ে গেল- পাগল বলে কী? এই লুঙ্গির মধ্যে চোর চোর গন্ধ! মনে মনে ভাবে হুজুর- আমি যে দানবাক্স থেকে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে বাক্স খুলে টাকা নিয়ে সেই টাকায় লুঙ্গি কিনেছি- ও তো দেখে নাই। ও কী করে জানলো এই চুরির টাকা দিয়ে লুঙ্গি কিনেছি। হুজুর পাগলকে বললো, তোমার যদি এই লুঙ্গি পরতে ভালো না লাগে, তাহলে এটা কাউকে দিয়ে দাও। ল্যাঠা চুকে যাক। এ কথা বলে হুজুর হন হন করে চলে গেল। হুজুর চলে যাওয়ার পর পাগল-ও ওই স্থান তাগ করলো।

মাস দুয়েক পরের কথা। দুপুর দু’টার দিকে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে, গলায় একটা হাজী রুমাল চাপিয়ে মিলাদের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন হুজুর। পথেই হুজুরের সঙ্গে পাগলটির দেখা। পাগল বললো, হুজুর, এত সুন্দর ও পরিপাটি পোশাক পরে কোথায় যাচ্ছেন? হুজুর বললেন, মিয়াপাড়ার ‘সাহেব মিয়ার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। মিলাদের দাওয়াত, অনেক বড় অনুষ্ঠান। সেখানে যাচ্ছি মিলাদ পড়াতে। ওখানে দুইটি গরু জবাই করেছে সাহেব মিয়া। গ্রামের সবাইকে খাওয়াবে। অনেক মানুষ হবে। তুমি দাওয়াতে যাইবা নাকি?’

পাগল বললো, ‘না হুজুর। আমি দাওয়াতে যাবো না। শূকরের মাংস আর মদের টাকায় খরচ করা ওই দাওয়াত আমার পেটে সইবে না। তার চেয়ে বরং আপনি যান। মিলাদ পড়ে আসেন। হুজুর পাগলকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে ভাবলো, ‘সাহেব মিয়া বিলাতে হোটেল ব্যবসা করেন। বিলাতে তার অনেক বড় হোটেল। প্রায় দুই-তিনশ’ কর্মচারী। সেখানে তিনি হালাল-হারাম সব খাবারই পরিবেশন করেন। ওখানে তার জমজমাট ব্যবসা। পাগল কী করে বুঝলো, এই টাকা শূকর আর মদ বিক্রির! সারাটা পথ হুজুরের মাথায় এই কথাগুলো কিলবিল করলো। লুঙ্গির মধ্যে চোর চোর গন্ধ... এটা কী করে জানলো? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সে জিয়াফতের বাড়িতে পৌঁছে গেল। মিলাদ শেষ করে খাওয়া-দাওয়া করে বাজার মসজিদে ফিরতে ফিরতেই আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেল।

ইছাপুরা বাজারে একটি পাকুড়গাছের নিচে প্রায়ই বসে থাকে পাগলটি। কোথায় খায়, কোথায় প্রাকৃতিক কাজ সারে কেউ দেখে না। তিনদিন থাকে তো সাতদিন তার খোঁজ পাওয়া যায় না। হাটের মানুষজন পাগলকে নিয়ে কিছুই ভাবে না। তারা সওদাপাতি ক্রয়-বিক্রয়েই ব্যস্ত থাকে।

মাস ছয়েক পরের কথা, হুজুর মসজিদে যাওয়ার পথে হঠাৎ দেখে পাগলটি পাকুড়গাছের নিচে বসে আছে। তিনি পাগলকে ইশারা করলেন। পাগলটি উঠে তার কাছে এসে দাঁড়ালো। হুজুর বললো, চলো আমার সঙ্গে। পাগল বললো, কোথায় হুজুর? লালচাঁন মুন্সি বললো, মসজিদে আমার সঙ্গে আজ নামাজ পড়বে। পাগলটি হুজুরের পেছনে পেছনে মসজিদের দিকে রওনা হলো। মসজিদের পাশেই ওজুখানা। হুজুর বললো, ওজুখানা থেকে ওজু করে আসো। আমি আজান দিচ্ছি। আজানের পরেই নামাজ শুরু হবে। পাগলটি ওজুখানায় ঢুকলো। ওজু করে আসতে আসতেই নামাজের সময় হয়ে গেল। হুজুর পাগলকে বললো, তুমি এই পেছনের কাতারে দাঁড়াও। পাগলটি হুজুরের কথামতো পেছনের কাতারে এসে দাঁড়ালো। একামত শেষে আল্লাহু আকবার বলে হুজুর নিয়ত বাঁধলেন। আসরের নামাজ শেষে ঘুরে বসতেই হুজুর দেখলেন পাগলটি নেই। হুজুর মোনাজাত শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসলেন। চারদিকে খুঁজলেন পাগলকে। কোথাও দেখলেন না।

বেশ কিছুদিন পর একদিন সকালের দিকে হুজুর একটি কাজের জন্য পাশের গ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে হঠাৎ নজরে পড়লো পাগলটিকে। হুজুর এগিয়ে গিয়ে বললেন, এই মিয়া, তুমি ওইদিন নামাজ শেষ না করেই চইলা আইলা কেন? পাগল বললো, হুজুর কী করুম? আপনে গঞ্জে গেলেন, বউয়ের জন্য শাড়ি কিনলেন, স্যান্ডেল কিনলেন। আমি তো গঞ্জে আপনার সঙ্গে যেতে পারলাম না, তাই আর নামাজ পড়তে পারলাম না। নামাজ থেকে বেরিয়ে এলাম। হুজুর পাগলের কথা শুনে থতমত খেয়ে গেলেন। তার মনে পড়লো ওইদিন নামাজের সময় তিনি মনে মনে বলছিলেন তিনি গঞ্জে যাবেন, বউয়ের জন্য শাড়ি কিনবেন, স্যান্ডেল কিনবেন। পাগল কী করে জানলো তার মনের কথা। তিনি আর ওই গ্রামে গেলেন না। সরাসরি বাড়িতে চলে এলেন।

শাবান মাসের শেষ শুক্রবার লালচাঁন মুন্সি সকালে চাসতের নামাজ শেষে কোরআন তেলাওয়াত শেষে উঠতে যাবেন ঠিক এ সময় দুজন ব্যক্তি এসে মসজিদের বারান্দায় দাঁড়ালেন। সালাম দিয়ে দুজনের মধ্যে বয়স্ক লোকটি বললেন, হুজুর আমার এক আত্মীয় গতকাল রাতে মারা গেছেন। তার জানাজা জোহরের নামাজের পর অনুষ্ঠিত হবে। আপনি জোহরের নামাজ শেষ করে রশিদ পাটোয়ারীর বাড়ি আসবেন। সেখানেই জানাজা হবে। এরপর ইছাপুরা কবরস্থানে লাশ দাফন হবে। হুজুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুই ব্যক্তি চলে গেলেন।

যথারীতি জোহরের নামাজ শেষে লালচাঁন মুন্সি রশিদ পাটোয়ারীর বাড়িতে প্রবেশ করতেই হৃদয়বিদারক কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন। রশিদ পাটোয়ারী হুজুরকে দেখে এগিয়ে এলেন। হুজুরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন হুজুর কী হয়ে গেল? জলজ্যান্ত তাগড়া ছেলেটা আমার এপেন্ডিসাইডের ব্যথায় এক রাতের মধ্যেই মারা গেল। চোখে দেখলাম। কিছুই করতে পারলাম না। হাসপাতালে নিতে নিতেই সব শেষ। আল্লাহ আমাকে কেন নিলো না? কেন আমার ছেলেকে নিলো। রশিদ পাটোয়ারীর কান্না শুনে বিলাপ করতে করতে এগিয়ে এলো তার স্ত্রী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রশিদ পাটোয়ারীর উদ্দেশ্যে তার স্ত্রী বললো, তোমার জন্যই আমার ছেলেকে হারালাম। তুমি যদি পাগলের কথামতো বরই গাছটি কাটতে তাহলে আমার ছেলে মারা যেতো না। সব দোষ তোমার। তুমিই আমার ছেলেকে মেরে ফেললে। লালচাঁন মুন্সি রশিদ পাটোয়ারীকে বললো, ‘কাল সকালের দিকে ইছাপুরা হাটের ওই পাগলটি এসেছিল। আমাদের বরই গাছটির দিকে তাকিয়ে আমাকে বললো, এই গাছটি কেটে ফেল। আমি বললাম- এই বরই গাছের বরই খুবই সুস্বাদু আর মিষ্টি। আর এই ধরন্ত গাছ কেটে ফেলবো তা কী করে হয়! আমি পাগলের কথায় কান দিলাম না। আর রাত্রেই আমার ছেলের শুরু হলো এপেন্ডিসাইডের ব্যথা। ব্যথার চোটে হাসপাতালে নেয়ার আগেই আমার ছেলেটি মারা গেল। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম। কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না। রশিদ পাটোয়ারীর স্ত্রী বললো, আমি পই পই করে বললাম গাছটি কাটো, তুমি কিছুতেই শুনলে না। যদি পাগলের কথা শুনতে তাহলে আমার ছেলেটির আজ এ অবস্থা হতো না।
লোকজন সবাই জানাজায় উপস্থিত হলে হুজুর জানাজা পড়াতে চলে গেলেন। জানাজার পর দাফন কাফন শেষে হুজুর আসরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই মসজিদের দিকে রওয়ানা দিলেন।

মসজিদে আসার পথে রশিদ পাটোয়ারী ও তার স্ত্রীর কান্নাজড়িত কথাগুলো তার কানে বাজছিল। ইছাপুরা হাটের ওই পাগলটি কোন ফাঁকে রশিদ পাটোয়ারীর বাড়ি গিয়েছিল তা সে টেরই পায়নি। আর পাগলটি ধরন্ত বরই গাছটি কাটতে বলছিল রশিদ পাটোয়ারীকে। কিন্তু রশিদ পাটোয়ারী পাগলের প্রলাপ বলে তাতে কান দেননি। যে কারণে আজ এই হৃদয়বিদারক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাটি তার মনে বিরাট দাগ ফেলে। লালচাঁন মুন্সি হাঁটতে হাঁটতে ইছাপুরা হাটে এসে উপস্থিত হন। হাটে পাগলটি যে পাকুড় গাছটির নিচে আশ্রয় নিয়েছিল সেই জায়গাটি সে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। পাকুড় গাছটির এপাশ ওপাশ, উপরের ডালপালাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুই দেখতে পায় না। পাকুড় গাছটির নিচে আসন পেতে বসা পাগলটিকে দেখা যায় না। লালচাঁন মুন্সি এরপর মসজিদের দিকে পা বাড়ায়। হঠাৎ তার কানে একটা আওয়াজ ভেসে আসে। হুজুর আপনি কী আমাকে খুঁজছিলেন? আমি তো এখানেই আছি। আপনি দেখতে পাচ্ছেন না। একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখুন, তবেই দেখতে পাবেন। লালচাঁন মুন্সি গাছটির পেছনে গিয়ে খুঁজেন। ইতিউতি করেন, কিন্তু কিছুতেই পাগলটিকে দেখতে পারলেন না। মনে মনে ভাবলেন আমি হয়তো এখনো ভালো মানুষ হইতে পারি নাই। যদি ভালো মানুষ হইতে পারতাম তবে নিশ্চয়ই পাগলকে দেখতে পাইতাম। লালচাঁন মুন্সি আর পাকুড় গাছটির দিকে তাকালেন না। হন হন করে মসজিদের দিকে রওয়ানা দিলেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন