হাতিরপুলের অন্য গল্প

হাতিরপুলের অন্য গল্প

ফন্ট সাইজ:

হাতিরপুল এক সময় হয়ে উঠে পাক্কি মামা’র মানতখানা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে সরাইলের বাড়িউড়ায় থাকা প্রাচীন এ নিদর্শনটি ঘিরে শুরু হয় আরেক গল্প।

মানতখানায় পরিণত করা হয় একে। নাম দেয়া হয় পাক্কি মামা’র মানতখানা। সপ্তাহের দু’দিন ভক্তরা জড়িত হতে থাকেন। মানত করেন মিষ্টি, মোরগ, ছাগল, খাসি সবই। যেকোনো মানত বিফলে যায় না। খাদেমদের এমন কথা ছাড়াও নানা কল্পকাহিনী ছড়িয়ে পড়ে এই মানতখানা নিয়ে। ১২ জন ওলি এসেছিলেন এখানে। তারা এখানে ১২ উড়া মাটি ফেলে বসে মিলাদ পড়েছিলেন। এটি ১২ ওলির আস্তানা। ১১ জন অন্যত্র চলে গেছেন। একজন রয়ে গেছেন। তিনি মাঝে মধ্যে আসেন। দু’একজনকে দেখা দেন। গ্রামের কারও বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হলে রান্নার পর প্রথম খাবার মানতখানায় দিলে খাবারের কমতি হয় না। এখানে মানত করে অনেকেই ফল পেয়েছেন। বাড়িউড়া বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী রহিছ আলী নিজে প্রতি বৃহস্পতিবার মানতখানায় বসে পড়া পানি, তেলপড়া দিতে শুরু করেন। তাতে মেয়ে-ছেলের বিয়েশাদি, দীর্ঘদিন ধরে যাদের বাচ্চা হয় না তাদের দ্রুত কাজ হয় বলে প্রচার করেন তিনি নিজেই। বলে বেড়ান, তার পড়াপানি খাওয়ার পর যাদের বিয়ে হয়নি ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে মাটি ফাইট্টা তাদের বিয়ে হয়। তবে এতে তার কোনো ক্ষমতা নাই। সবই মালিক করেন। সপ্তাহের দু’দিন ৭-৮ মণ মিষ্টি, জিলাপি মানতখানায় আসে। নগদ টাকাও পড়ে। ২০০৫ কিংবা ২০০৬ সালের দিকে পুরোপুরি জমে উঠে মানতখানা।

স্থানীয় বাসিন্দা আক্কাস, রহিস আলী নিজেদেরকে খাদেম পরিচয় দিয়ে হাতিরপুলকে নিয়ে ছড়িয়ে দেন কল্পকাহিনী। চার পুরুষের উত্তরাধিকারে তারা খাদেম হয়েছেন বলেও জানান দেন। তখন থেকেই হাতিরপুল তার মূল পরিচয় হারাতে বসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের তথ্যবাতায়ন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়ান শাহবাজ আলী খান বাড়িউরা এলাকায় পুলটি নির্মাণ করেন। কথিত আছে দেওয়ানরা হাতির পিঠে করে চলাচল করতেন এবং পুলটির গোড়ায় হাতি নিয়ে বিশ্রাম করতেন। সেজন্য এটিকে হাতিরপুল বলা হয়ে থাকে। বাড়িউরা বাজার সংলগ্ন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের গা-ঘেঁষেই এই পুলের অবস্থান। এই পুল নির্মাণের ইতিহাস সম্পর্কে আরও জানা যায়, সমতট জনপদের অংশ সরাইল অঞ্চলে ঈশা খাঁ তার অস্থায়ী রাজধানী স্থাপন করার পর শাহবাজ খান দেওয়ানি লাভ করে শাহবাজপুরে তার কাচারি নির্মাণ করেন। তার নিবাস সরাইলে হওয়ার কারণে শাহবাজপুরে যাতায়াতের জন্য সরাইল থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত আনুমানিক ১৬৫০ সালে তিনি একটি রাস্তা নির্মাণ করেন। বর্তমানে পরিত্যক্ত রাস্তাটি কুট্টাপাড়া মোড় থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। যেটি স্থানীয়দের কাছে জাঙ্গাল নামে পরিচিত।

এই রাস্তাতেই শাহবাজ খান পুলটি নির্মাণ করেন। এনিয়ে জনশ্রুতি রয়েছে, দেওয়ান শাহবাজ আলী এবং বিজয়নগর উপজেলার হরষপুরের জমিদার দেওয়ান নুর মোহাম্মদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। খালের উপর নির্মিত এই পুল দিয়েই হরষপুরে যাতায়াত করতেন দেওয়ান শাহবাজ আলী। যাত্রাপথে পুলের গোড়ায় হাতি নিয়ে বিশ্রাম করতেন তিনি। এ জন্য এটিকে হাতিরপুল বলা হয়। আর এই পুলটিই ছিল এলাকার প্রথম কোনো পাকা স্থাপনা। সেজন্য এটিকে পাক্কা বা পাক্কি নামেও ডাকা হয়।

মোঘল শাসনামলে চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত ঐতিহাসিক এই পুলটিকে দেশের অমূল্য সম্পদ ও পুরাকীর্তির অনন্য নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। তবে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অবহেলায় পুলটি ঝোপে বেষ্টিত হয়ে পড়েছিল বহুদিন। তখন থেকেই এতে ভর করে কুসংস্কার! এটিকে মাজার বানিয়ে উপাসনা শুরু হয়।
তবে মানুষজনের এই বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে সরাইল উপজেলা প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একাধিকবার সেই আসর ভেঙে দিয়েছে। এটি একটি পুরাকীর্তি ছাড়া কিছুই নয় বলে জানায় প্রশাসন ও প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন