১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এমন এক সামরিক সংঘর্ষ, যা সময়ের হিসাবে অতি স্বল্প হলেও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর। মিশর, জর্ডান ও সিরিয়ার সঙ্গে ইসরাইলের এই যুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল বহু বছরের সীমান্ত উত্তেজনা, আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং কৌশলগত নিরাপত্তা উদ্বেগের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকে এই অঞ্চলে যে অস্থির যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং ১৯৬০-এর দশকে এসে তা সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।
এই উত্তেজনার মূল ভিত্তি ছিল ভৌগোলিক নিরাপত্তা, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার। সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যে গোলান মালভূমি নিয়ে সীমান্ত সংঘর্ষ নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। গোলান থেকে নেমে আসা পানি জর্ডান নদী ও গ্যালিলি সাগরকে পুষ্ট করতো, যা ইসরাইলের পানির প্রধান উৎসগুলোর একটি। ইসরাইল যখন এই পানির প্রবাহকে জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে ব্যবহার শুরু করে এবং তা দক্ষিণের নেগেভ মরুভূমির দিকে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়, তখন সিরিয়া এটিকে কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখে। এর প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়া একটি খাল খননের কাজ শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল পানির প্রবাহ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়া। এই পানি-কেন্দ্রিক বিরোধ খুব দ্রুত সামরিক উত্তেজনায় রূপ নেয়, কারণ এটি সরাসরি রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
অন্যদিকে মিশরের নেতৃত্বে আরব জাতীয়তাবাদ নতুন করে শক্তি অর্জন করে। প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের নিজেকে আরব বিশ্বের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা ধীরে ধীরে সামরিক জোটের রূপ নেয়। এই সময়ে ইসরাইল নিজেকে কৌশলগতভাবে শত্রু রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ভাবতে শুরু করে, কারণ নাসেরের নেতৃত্বে মিশর, জর্ডান ও সিরিয়া সামরিক সমন্বয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
১৯৬৭ সালের মে মাসে পরিস্থিতি দ্রুত সংকটের দিকে অগ্রসর হয়। মিশর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীকে সিনাই উপদ্বীপ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়, যা ওই অঞ্চলের বিদ্যমান বাফার ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। একই সঙ্গে তিরান প্রণালি বন্ধ করে ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর এলাতের সমুদ্রপথ কার্যত অবরুদ্ধ করে দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল, কারণ এই জলপথ ছিল আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। ইসরাইল এটিকে সরাসরি যুদ্ধের কারণ হিসেবে বিবেচনা করে এবং পরিস্থিতি দ্রুত সামরিক সংঘাতের দিকে গড়াতে থাকে।
ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থান ছিল ভৌগোলিকভাবে দুর্বল। ছোট ভূখণ্ড, সীমিত জনসংখ্যা এবং দীর্ঘ সীমান্তের কারণে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনায় অনিশ্চয়তার মুখে ছিল। চারপাশে শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের উপস্থিতি তাদের কৌশলকে প্রতিরক্ষামূলক থেকে আক্রমণাত্মকের দিকে নিয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইল একটি মৌলিক সামরিক নীতি গ্রহণ করে। যা প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক বা আগাম হামলা নামে পরিচিত। যার উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর আক্রমণের আগেই তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা।
১৯৬৭ সালের ৫ই জুন সকালে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ ঘটে। ইসরাইল মিশরের বিমানঘাঁটিতে সমন্বিত ও আকস্মিক বিমান হামলা চালায়। এই আক্রমণ ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। লক্ষ্য ছিল রানওয়ে, জ্বালানি মজুত এবং বিমান বাহিনীর প্রধান সম্পদগুলোকে অচল করা। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিশরের বিমান বাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় স্থলযুদ্ধে মিশরের সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। এই ঘটনা যুদ্ধের পুরো গতিপথকে একদিকে ঠেলে দেয় এবং আকাশে ইসরাইলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
এই আঘাতের পর একই ধরনের অভিযান জর্ডান ও সিরিয়ার বিমান বাহিনীর ওপর পরিচালিত হয়। ফলস্বরূপ আরব রাষ্ট্রগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। আকাশ নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পর স্থলযুদ্ধে ইসরাইলের বড় কৌশলগত সুবিধা অর্জন করে। তারা একই সঙ্গে তিনটি ফ্রন্টে অভিযান শুরু করে। যার মধ্যে রয়েছে সিনাই, পশ্চিম তীর এবং গোলান মালভূমি।
সিনাই ফ্রন্টে মিশরীয় বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিলেও তারা দ্রুতই সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। আকাশ পথে সমর্থন না থাকায় তাদের স্থল অবস্থানগুলো একের পর এক ভেঙে পড়ে। ইসরাইলি বাহিনী দ্রুতগতির ম্যানুভার যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করে গভীরভাবে অগ্রসর হয় এবং সিনাই উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়।
পশ্চিম তীরে জর্ডানীয় বাহিনী রাজনৈতিক ও সামরিক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। ভুল গোয়েন্দা তথ্য এবং আরব নেতৃত্বের চাপ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। যুদ্ধে জড়িয়ে একটি অসম কৌশলগত অবস্থানে পড়ে যায় জর্ডান। ইসরাইল দ্রুত পশ্চিম তীরের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো দখল করে নেয় এবং জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হয়। জেরুজালেমে জর্ডানীয় প্রতিরক্ষা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও তা বিচ্ছিন্ন এবং সমন্বয়হীন ছিল।
গোলান মালভূমিতে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা ছিল ভৌগোলিকভাবে শক্তিশালী কিন্তু কৌশলগতভাবে জটিল। পাহাড়ি ভূখণ্ড, মাইনফিল্ড, বাঙ্কার এবং স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা ইসরাইলি অগ্রগতিকে ধীর করে দেয়। তবে আকাশ পথে বিমান বাহিনীর সমর্থন এবং স্থল বাহিনীর সমন্বিত আক্রমণের মাধ্যমে ইসরাইল ধাপে ধাপে এই প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলে। সিরিয়ার বাহিনী শেষ পর্যন্ত কৌশলগত পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয় এবং দামেস্কের দিকে ফিরে যায়।
এই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। মিশর, জর্ডান ও সিরিয়া রাজনৈতিকভাবে একত্রিত অবস্থান নিলেও সামরিক কৌশল, সময় এবং বাস্তব প্রয়োগে তারা পৃথকভাবে কাজ করে। এর ফলে প্রতিটি ফ্রন্ট আলাদাভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইসরাইল এক ফ্রন্টে চাপ সৃষ্টি করে অন্য ফ্রন্টে রিজার্ভ স্থানান্তরের সুযোগ পায়। এই অপারেশনাল নমনীয়তা যুদ্ধের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করে।
মাত্র ছয়দিনের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। ইসরাইল সিনাই উপদ্বীপ, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। মানবিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে আরব রাষ্ট্রগুলো ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যেখানে ইসরাইলের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে। তবে এই সামরিক বিজয় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করে, যা পরবর্তী দশকগুলোতে আরও জটিল আকার ধারণ করে। দখলকৃত ভূখণ্ডগুলো দ্রুতই আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বসতি স্থাপন, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আইনগত অবস্থান নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক শুরু হয়। সিনাই পরবর্তীতে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে মিশরের কাছে ফেরত দেয়া হলেও পশ্চিম তীর ও গোলান মালভূমি আজও অনির্ধারিত রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। এই ভূখণ্ডগুলো ঘিরে সংঘাত, আলোচনা এবং অস্থিরতা পরবর্তী দশকগুলোতে বারবার ফিরে এসেছে, যা এখনো বিদ্যমান।
এইভাবে ছয়দিনের যুদ্ধ কেবল একটি দ্রুত সামরিক বিজয়ের ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করেছে। যুদ্ধের গতি, আকাশ নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের সমন্বয় এটিকে আধুনিক সামরিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে যে, সামরিক বিজয় সবসময় স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা নতুন সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে, যা এই অঞ্চলের ইতিহাসে পরবর্তী দশকগুলোতে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।
(এটি যুক্তরাজ্যের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট-এর বিশ্লেষকদের মতামতের ভিত্তিতে লেখা।)
