২৫শে এপ্রিল ছিলো চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ দিবস উপলক্ষে স্মরণ করছি এক অকুতোভয় যোদ্ধাকে, যিনি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাকে ভূমিদস্যু, অপরাধী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রয়োগ করেছিলেন। আমি চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকালে, কাছ থেকে তাকে দেখেছি, কী প্রচণ্ড চাপ, হুমকি ও রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী।
চট্টগ্রাম বন্দরের বিশাল আয়তনের ভূমি সম্পদ উদ্ধার অভিযানের সফল অধিনায়ক মুনীর চৌধুরী, যা বন্দরের শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসে অনন্য রেকর্ড। তার দুঃসাহসী অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দর ফিরে পায় দশকের পর দশক এমনকি অর্ধশত বছরের অবৈধ দখলকৃত প্রায় দু’হাজার কোটি টাকার ভূমিসম্পদ ও রাজস্ব, বর্তমানে এর বাজার মূল্য দাঁড়াবে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা। দেড় দশক আগে মুনীর চৌধুরীর উদ্ধারকৃত জমি এখনো বন্দরের সম্প্রসারণ ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদে রূপান্তরিত হচ্ছে। মুনীর চৌধুরীর সততা, সাহসিকতা এবং দেশপ্রেমের জন্য তাকে নিয়ে আমি গর্ব করি, তিনি বাংলাদেশের অনন্য সম্পদ।
?মুনীর চৌধুরী জলে ও স্থলে হাজার হাজার দুঃসাহসী অভিযানের এক কিংবদন্তি, নিজ উদ্যোগে ও উৎসাহে অপরাধ ও দুর্নীতি খুঁজে খুঁজে বের করতেন তিনি। নৌ দুর্ঘটনা রোধে তাকে ঢাকার মেরিন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি দেশব্যাপী নৌপথে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে শত শত নৌযান আটক ও জরিমানার মাধ্যমে অভূতপূর্ব শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। একপর্যায়ে তদানীন্তন সরকার প্রধানের পারিবারিক মালিকানাধীন কোকো জাহাজ আটক ও দণ্ডিত করে তিনি প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দেন, ফলে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। এ সময়ে শিপিং সেক্টরে বড় বড় দুর্নীতি উদ্ঘাটন করে কোটি কোটি টাকা রাজস্বও আদায় করেন।
সমগ্র বন্দর জুড়ে মুনীর চৌধুরী ছিলেন একদিকে আতঙ্ক, অন্যদিকে শ্রদ্ধার পাত্র। তার অফিসটি ছিল অতি সাদামাটা, ছিল না দামি আসবাব, সাজসজ্জা, এয়ার কন্ডিশনার। একটি সাধারণ পিকআপ ছিল তার বাহন। রাত-দিন ক্লান্তিহীনভাবে তাকে দেখা যেতো বন্দরের জল বা স্থলসীমায় অভিযানে ডুবে থাকতে।
পরিবেশ দূষণ, শুল্ক ফাঁকি অথবা বন্দর আইন লঙ্ঘনের অপরাধে দেশি-বিদেশি শত শত জাহাজ আটক, ক্রেন ও বুলডোজার নিয়ে অবৈধ বহুতল ভবন ধ্বংস, ডকইয়ার্ড, গোডাউন কিংবা নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, এভাবে বারিক বিল্ডিং হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা আয়ত্তে এনে বন্দরের খধহফংপধঢ়ব বদলে দেন মুনীর চৌধুরী। বন্দরের শত বছরের ইতিহাসে বিদেশি জাহাজ আটকের ক্ষমতা ইতিপূর্বে বন্দর প্রশাসন বা ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রয়োগের সাহস দেখায়নি।
সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা বন্ধের মধ্যেও তার অভিযানের বিরতি ছিল না। রাডারের মতো বন্দরের জল ও স্থলসীমা পাহারা দিয়ে রাখতেন। এ সময় বন্দরে ওভারলোডেড বা এলোপাতাড়ি নোঙর করা জাহাজ চলাচল অনেক হ্রাস পায়। ওয়াকিটকি, বাইনোকুলার, ক্যামেরা ও টাগবোট নিয়ে যোদ্ধাবেশে নদী বা সমুদ্র দূষণকারী জাহাজ আটক করে তিনি দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনেন। কর্ণফুলীতে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ করেছিলেন তিনি। দেশি-বিদেশি জাহাজের ক্যাপ্টেনরা প্রচণ্ড ভীতি নিয়ে নৌ আইন মেনে জাহাজ চালাতো। তার পেছনে অনেক ভয়ঙ্কর শত্রু ছিল, কিন্তু কখনো মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম জুড়ে খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ চুরি, অবৈধ যান চলাচল, পরিবেশ দূষণ, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, অবৈধ পণ্য মজুত, অনৈতিক ব্যবসা, পাহাড় কাটা, অবৈধ ভবন নির্মাণ, হাসপাতাল-ক্লিনিকে অপচিকিৎসাসহ অসংখ্য বড় বড় দুর্নীতি ও অপরাধের মূলোৎপাটন করেছেন মুনীর চৌধুরী। একাধারে ১২টি সংস্থার ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব কাঁধে নিলেও কোথাও অতিরিক্ত বেতন/ভাতা তুলেননি। দুর্ভাগ্য, ১/১১ এর কতিপয় উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তা তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বন্দর থেকে সরিয়ে দেন। তার বিরুদ্ধে ভীতিকর গোয়েন্দা রিপোর্টসহ প্রতিহিংসামূলক চাপ সৃষ্টি করা হয়।
তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে তিনি ‘পোর্টের মুনীর’ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। শক্ত হাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী তাকে ‘টাইগার অফ চিটাগং’ নামে অভিহিত করতেন। অথচ সেই মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর নির্মিত একটি বিশাল জেটি কর্ণফুলী নদী থেকে উচ্ছেদ করে তার চক্ষুশূল হয়েছিলেন। নৌপরিবহন মন্ত্রী কর্নেল আকবর হোসেন মুনীর চৌধুরীর দুর্দান্ত অভিযানে বিস্মিত হয়ে তার নাম দিয়েছিলেন ‘ডধঃবৎ ঞবৎৎড়ৎরংঃ’। নীরব ও নিভৃতচারী ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর মিডিয়ার সামনে হাজির হতেন না, কিন্তু মিডিয়া তার অভিযানের পেছনে ছুটতো।
মুনীর চৌধুরী অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীদের খাদ্যে ভেজাল ও মজুতদারির জন্য গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠান। জব্দ করেন শত শত টন দূষিত ও ভেজাল খাদ্য এবং ওষুধ। একবার ইউক্রেন থেকে আসা এক জাহাজ আটক করে জব্দ ও ধ্বংস করেন ১১০০ টন পচা গম, মন্ত্রী ও এমপিদের হুমকির মুখেও তিনি মাথানত করেননি। বন্দরের বাইরে চট্টগ্রাম ওয়াসার হাজার কোটি টাকার জমিও উদ্ধার করেছিলেন, যে জমিতে চীনা সহায়তায় বর্তমানে বাস্তবায়িত হচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগরীর স্যুয়ারেজ মাস্টার প্ল্যান।
মুনীর চৌধুরীর বিদেশ ভ্রমণে একেবারে লোভ ছিল না। একবার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বহু অনুরোধে তাকে বিদেশ পাঠানোর পর তিনি ফিরে এসে ভ্রমণের উদ্বৃত্ত টাকা বন্দর তহবিলে জমা দেন। এমনকি বন্দরে শত শত কিলোমিটার নৌ বা স্থল পথে অভিযানের ভ্রমণ বিলের অর্থও তিনি কখনো তোলেননি।
তাকে দুদকের মহাপরিচালকের পদে দায়িত্ব দেয়া হলে দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালদের ধরপাকড় শুরু করেন। তার এনফোর্সমেন্ট অভিযানে সরকারি অফিসের কর্মকর্তাদের ট্র্যাপ কেসের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হলে প্রশাসনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খোদ দুদক চেয়ারম্যানের দুর্নীতির গোপন তথ্য উদ্ঘাটন করে তিনি তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গেলে ‘সরকারবিরোধী তৎপরতার’ অভিযোগ এনে মুনীর চৌধুরীকে বিজ্ঞান জাদুঘরে নির্বাসনে (!) পাঠানো হয়।
দুর্নীতি নির্মূলে মুনীর চৌধুরী যে সিদ্ধহস্ত, তার প্রমাণ ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নামক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ চুরি ও রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত ১২শ’ কোটি টাকা উদ্ধার, মিল্ক ভিটা নামক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রি ৩৩২ কোটি টাকা থেকে ৪৬৮ কোটি টাকায় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানসনদ লাভ, এমনকি চট্টগ্রাম ওয়াসার লোকসান কাটিয়ে ৩৪ কোটি টাকা বকেয়া রাজস্ব আদায় করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরে রাজস্ব আয় ৩১ কোটি টাকা থেকে ১২৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয় এবং দেশে বেপরোয়া দূষণের মাত্রা কমে আসে। জানা যায়, তারই চাপে পড়ে শত শত শিল্প কারখানা বর্জ্য পরিশোধন প্রযুক্তি স্থাপনে বাধ্য হয়। এমনকি দূষণকারী শত শত ইটভাটা উচ্ছেদ করায় দেশে বহু আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা চালু হয়। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ এবং ‘আল জাজিরায়’ তার দুঃসাহসী অভিযানের ঘটনা প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপে তাকে পরিবেশ থেকেও সরিয়ে দেয়া হয়।
এসব দৃষ্টান্ত মুনীর চৌধুরীর অসাধারণ সাহস, কর্মদক্ষতা ও গভীর দেশপ্রেমের প্রমাণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার মুনীর চৌধুরীকে রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে (সম্ভবত দুদক চেয়ারম্যান) দায়িত্ব দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বলে জানা যায়।
ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটিয়ে কী অপরিমেয় প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য আনা যায়, মুনীর চৌধুরী তার জ্বলন্ত উদাহরণ। আজ চট্টগ্রাম বন্দর দিবসে আমার প্রাণের দাবি, ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরীর নামে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি জেটি, টার্মিনাল কিংবা ভবনের নামকরণ করা হলে এই কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হবে।
লেখক: প্রাক্তন সদস্য (প্রকৌশল) ও প্রধান প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

muhammad NuruL ISLAM
১ মাস আগেএ দেশে ভালো মানুষের দাম নেই,মুনির চৌধুরীরা শত বছরে একজনই একবার জন্মে।