কিংবদন্তির আড়ালে চাপা পড়া ইতিহাস যখন বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে যাচাই করা হয়, তখন বেরিয়ে আসে বিস্ময়কর সব তথ্য। বগুড়ার মহাস্থানগড় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ‘গোকুল মেধ’ এমনই এক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যা সাধারণ মানুষের কাছে কয়েক শতাব্দী ধরে ‘বেহুলার বাসরঘর’ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু মনসামঙ্গলের সেই করুণ প্রেমগাথার বাইরে যদি আমরা স্থাপনাটির ইটের বিন্যাস আর কাঠামোর দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে এটি আসলে প্রাচীন বাংলার এক অনন্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বাক্ষর।
আজ থেকে প্রায় ১৩০০ বছর আগে, যখন আজকের মতো অত্যাধুনিক রড, সিমেন্ট বা ক্রেন ছিল না, তখন কীভাবে সমতল ভূমি থেকে একটি মন্দিরকে পাহাড়ের উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? উত্তরটি লুকিয়ে আছে গোকুল মেধের সেই ১৭২টি কুঠুরির গোলকধাঁধায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা একে বলছেন ‘সেলুলার কনস্ট্রাকশন’ বা মৌচাক আকৃতির স্থাপত্য কৌশল। এটি একটি ঘরের পাশাপাশি ছিল সুউচ্চ স্থাপনার শক্তিশালী ভিত্তি বা ‘ফাউন্ডেশন’।
তৎকালীন স্থাপত্যবিদরা জানতেন, নরম পলিমাটির এই জনপদে বিশাল ও ভারী কোনো স্থাপনা তৈরি করতে গেলে তার ভার বহনের ক্ষমতা বা ‘লোড বিয়ারিং ক্যাপাসিটি’ বাড়ানোই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা মাটির নিচে বা সমতলে ভিত্তি না গড়ে, একের পর এক কুঠুরি তৈরি করে তার ওপর মাটি ভরাট করে যে উঁচু মঞ্চ তৈরি করেছিলেন, তা আজকের যুগের মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিংয়ের মেকানিজমের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
আমরা যখন বেহুলার বাসরঘর নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের কল্পনায় কেবল লোহার বাসরঘর আর সাপের আনাগোনা ভেসে ওঠে। কিন্তু গোকুল মেধের এই ধ্বংসাবশেষ সাক্ষী দিচ্ছে যে, সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর সেই কারিগরেরা জানতেন কীভাবে ইটের পর ইট গেঁথে প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে জয় করে এক ‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ বা গগনচুম্বী মন্দির গড়ে তোলা যায়। রূপকথার মায়া সরিয়ে সেই প্রাচীন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রহস্য উন্মোচন করার চেষ্টা করবো এই লেখায়, যা গোকুল মেধকে লোকগাঁথার পাশাপাশি ইতিহাসের এক মহাবিস্ময় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
মিথ ও ইতিহাসের সেতুবন্ধন: জীবন মৈত্রের কাব্যিক কারিগরি: প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে গোকুল মেধ একটি সুপ্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্য হলেও, একে গণমানুষের হৃদয়ে ‘বেহুলার বাসরঘর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে প্রধান কৃতিত্ব ১৮শ’ শতাব্দীর প্রখ্যাত কবি জীবন মৈত্রের। ১৭৪৪ সালে বগুড়ার তৎকালীন সামাজিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী কাব্য ‘পদ্মপুরাণ’ (মনসামঙ্গল)।
জীবন মৈত্রই প্রথম তাঁর লেখনীর মাধ্যমে এই বিশাল ইটের কাঠামোকে এক নিশ্ছিদ্র লৌহ বাসরঘরের মিথলজিক্যাল রূপ দান করেন। ফলে ৭ম শতাব্দীর একটি ধর্মীয় বা কৌশলগত স্থাপনা ১৮শ’ শতাব্দীর সাহিত্যিক প্রভাবে এক অমর ট্র্যাজেডির প্রতীকে পরিণত হয়। প্রকৌশলবিদ্যার এই বিস্ময়কে লোকগাথার মোড়কে মুড়িয়ে দেয়ার এই যে সাহিত্যিক প্রচেষ্টা, তা-ই গোকুল মেধকে উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।
অসম্ভবকে সম্ভব করা সেই ১৭২টি কুঠুরির রহস্য’: গোকুল মেধের সামনে দাঁড়ালে প্রথমেই যে প্রশ্নটি মনে জাগে তা হলো, একই জায়গায় কেন এতগুলো ছোট ছোট চৌকো কুঠুরি? পর্যটকরা একে বাসরঘর মনে করলেও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় এটি ছিল মূলত একটি ‘ভার্টিক্যাল কলাম সাপোর্ট’। সপ্তম শতাব্দীর সেই স্থপতিরা জানতেন, সমতল ভূমি থেকে ৪৩ ফুট উঁচুতে একটি বিশাল মন্দির স্থাপন করতে হলে কেবল মাটির ঢিবি দিয়ে কাজ হবে না; মাটির চাপে দেয়াল ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এই ঝুঁকি এড়াতে তারা অদ্ভুত এক কৌশল অবলম্বন করলেন। তারা একটির ওপর আরেকটি, এভাবে মোট ১৭২টি কুঠুরি তৈরি করলেন। নিচ থেকে উপরের দিকে এই কুঠুরিগুলো ধাপ বা ‘টায়ার’ হিসেবে সাজানো। মজার ব্যাপার হলো, এই কুঠুরিগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যে, এর আকার নিচ থেকে উপরে ওঠার সময় ছোট হয়ে এসেছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে একটি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় পিরামিড সদৃশ কাঠামো।
এই পদ্ধতিকে আধুনিক স্থাপত্যে বলা হয় ‘মৌচাক আকৃতির বা সেলুলার ফাউন্ডেশন’। প্রতিটি কুঠুরি যখন মাটি দিয়ে ভরাট করা হতো, তখন সেগুলো একেকটি শক্তিশালী পিলারের মতো কাজ করতো। এর ফলে পুরো স্থাপনার ভার সমানভাবে ছড়িয়ে পড়তো এবং কয়েকশ’ বছর ধরে মাটির প্রবল চাপ ও ভূমিকম্পের পরেও কাঠামোটি ধসে পড়েনি। প্রাচীন বাংলার কারিগরদের এই বুদ্ধিমত্তা আজকের দিনের ‘ফ্ল্যাট স্ল্যাব’ বা ‘গ্রিড ফাউন্ডেশন’-এর চেয়ে কোনো অংশে কম বৈপ্লবিক ছিল না। তারা আসলে মাটির ভেতরেই একটি ইটের তৈরি কৃত্রিম পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন।
সিমেন্টবিহীন গাঁথুনি ও জ্যামিতিক বুননের কারিগরি জয়গান: গোকুল মেধের এই বিশাল যজ্ঞের সামনে দাঁড়ালে আধুনিক স্থপতিদেরও কপালে ভাঁজ পড়ে যায় একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে, আজকের দিনে যেখানে সিমেন্ট আর রডের মেয়াদ একশ’ বছর পার হতে না হতেই ফাটল ধরে, সেখানে কোনো শক্তিশালী আঠা বা রিইনফোর্সমেন্ট ছাড়াই এই স্থাপনা তেরোশ’ বছর টিকে রইলো কীভাবে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে প্রাচীন বাংলার কারিগরদের সেই বিস্ময়কর ‘বন্ডিং’ মেকানিজম এবং ইটের জ্যামিতিক বিন্যাসের মধ্যে। এটি ছিল প্রতিটি ইটের ওপর প্রকৃতির বিরুদ্ধ শক্তিকে হিসাব করে বসানোর এক গণিত।
প্রথমেই নজর দেয়া যাক তাদের ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণের দিকে। সেই সপ্তম শতাব্দীতে আজকের মতো পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ছিল না। তারা ব্যবহার করতো চুন, সুরকি এবং এক বিশেষ ধরনের আঠালো মাটির মিশ্রণ। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এই মিশ্রণে অনেক সময় চিটাগুড় কিংবা পশুর হাড়ের চূর্ণ বা ভেষজ ক্বাথ মেশানো হতো, যা মাটির রাসায়নিক গুণাগুণ বদলে দিয়ে একে পাথরসম শক্ত করে তুলতো। কিন্তু কেবল উপকরণই শেষ কথা নয়; আসল কেরামতি ছিল ইটের আকার ও গাঁথুনিতে। এই স্থাপনার জন্য তৈরি প্রতিটি ইট ছিল সমকালীন সময়ের অন্যান্য ইটের চেয়ে আলাদা, বেশ চওড়া এবং ওজনে ভারী। এই বাড়তি ওজনই ছিল স্থাপনার শক্তির মূল উৎস। অভিকর্ষজ বলকে কাজে লাগিয়ে তারা ইটের স্তূপকে এমনভাবে গেঁথেছিলেন যে, একটি ইট অন্যটিকে প্রাকৃতিক চাপে ধরে রাখে।
এবার আসা যাক এই কাঠামোর জ্যামিতিক প্রকৌশলে। গোকুল মেধের নকশাটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এখানে প্রতিটি সারির ইট তার নিচের সারির ইটের সঙ্গে এমন এক কোণে বসানো হয়েছে যা ভূমিকম্পের কম্পনকেও সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। একে আমরা বলতে পারি ‘স্ট্যাগারড বন্ডিং’। এই কৌশলের ফলে যখন কোনো কম্পন বা মাটির ধস অনুভূত হয়, তখন পুরো স্থাপনার ভার কেবল একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে না পড়ে বরং ১৭২টি কুঠুরির দেয়ালে ছড়িয়ে যায়। এটি ছিল এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘শক অ্যাবজরবার’ সিস্টেম। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যখন আমরা স্ট্রেস ডিস্ট্রিবিউশন বা ভার বণ্টন নিয়ে পড়ি, তখন এই প্রাচীন কাঠামোটি তার এক জীবন্ত রেফারেন্স হিসেবে সামনে চলে আসে।
আরেকটি চমকপ্রদ দিক হলো এর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ‘ড্রেনেজ ইঞ্জিনিয়ারিং’। এই উঁচু ঢিবি’র ভেতর যাতে বৃষ্টির পানি জমে মাটিকে নরম করে না দেয়, সে জন্য কারিগররা ভেতরের কুঠুরিগুলোর ঢালু বিন্যাস এমনভাবে করেছিলেন যাতে আর্দ্রতা দেয়ালে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে না পারে। তারা জানতেন, পানিই হচ্ছে যেকোনো ইটের স্থাপনার প্রধান শত্রু। তাই ভেতরের ভরাট করা মাটির সঙ্গে স্তরে স্তরে কয়লা বা বালুর ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে আজও অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই যে নিখুঁত জ্যামিতি, মাটির সঙ্গে ইটের সন্ধি এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা, এই পুরো প্রক্রিয়াটি আমাদের শেখায় যে ‘হাই-রাইজ’ মানেই কেবল আকাশছোঁয়া উচ্চতা নয়, বরং মাটির গভীরে তার শেকড় কতোটুকু বিজ্ঞানসম্মতভাবে পোঁতা আছে তা-ই আসল। গোকুল মেধের সেই নাম না জানা কারিগররা কোনো ফরমাল ডিগ্রি ছাড়াই জানতেন যে, একটি পাহাড়সম স্থাপনা তৈরি করতে গেলে পেশিশক্তি নয়, ইটের ভাঁজে ভাঁজে গণিত আর রসায়নের সমন্বয় ঘটাতে হয়। পাঠক যখন এই ধ্বংসাবশেষের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে, তখন সে আসলে তেরোশ বছর আগের একদল জিনিয়াস ইঞ্জিনিয়ারের মস্তিষ্কের ভেতরেই ভ্রমণ করে। এই স্থাপত্যে কোনো বাহুল্য নেই, কোনো বাড়তি অলঙ্করণ নেই; যা আছে তা হলো নিরেট বিজ্ঞান আর টিকে থাকার এক একগুঁয়ে জেদ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঢাল ও স্পেশিয়াল প্ল্যানিংয়ের দূরদর্শিতা: গোকুল মেধ বা এই তথাকথিত বাসরঘরের দেয়ালগুলোর দিকে তাকালে আপনি দেখবেন, এগুলো সাধারণ দেয়ালের চেয়ে অনেক বেশি চওড়া। কিন্তু এই চওড়া হওয়ার পেছনে ছিল এক গভীর পরিবেশগত চিন্তা। উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া চিরকালই কিছুটা চরমভাবাপন্ন, প্রবল গরম আর বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টিপাত। সপ্তম শতাব্দীর স্থপতিরা জানতেন, একটি উঁচুতে অবস্থিত স্থাপনাকে যদি দীর্ঘস্থায়ী করতে হয়, তবে তাকে প্রকৃতির রুদ্ররূপ থেকে বাঁচানোর কৌশল আয়ত্ত করতে হবে। এই স্থাপত্যের প্রতিটি ধাপ বা টায়ারের যে বিন্যাস, তা আসলে এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক থার্মাল কন্ট্রোল’ হিসেবে কাজ করতো। পুরু ইটের দেয়াল এবং ভেতরের মাটি ভরাট কুঠুরিগুলো বাইরের প্রচণ্ড তাপকে ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দিতো, যা আধুনিক যুগের ‘গ্রিন বিল্ডিং’ কনসেপ্টের এক আদি সংস্করণ।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই ১৭২টি কুঠুরির ভেতরে কি শুধুই মাটি ছিল? প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, এই কুঠুরিগুলো কেবল মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়নি, বরং সেখানে স্তরে স্তরে ভিন্ন ভিন্ন ঘনত্বের উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল। একে আমরা আধুনিক সয়েল মেকানিক্সের ভাষায় ‘কম্প্যাকশন’ বলতে পারি। কারিগররা জানতেন, যদি সমজাতীয় মাটি দিয়ে এত বড় গর্ত ভরাট করা হয়, তবে বৃষ্টির পানিতে তা বসে যেতে পারে বা স্থাপনায় ফাটল ধরতে পারে। তাই তারা স্তরে স্তরে ইট ভাঙা, বালু এবং এঁটেল মাটির এক সংমিশ্রণ তৈরি করেছিলেন। এই বৈচিত্র্যময় ভরাট কৌশল স্থাপনাটিকে একটি নমনীয়তা বা ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ দান করেছিল। যার ফলে তেরোশ বছর ধরে এই জনপদে হওয়া শত শত ছোট-বড় ভূমিকম্পের ঝাপটা এই স্থাপনাটি অনায়াসেই হজম করে নিয়েছে। যেখানে আধুনিক দালানগুলো ভূমিকম্পের সময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে, সেখানে গোকুল মেধ তার কুঠুরিগুলোর জ্যামিতিক বিন্যাসের কারণে মাটির কম্পনকে পুরো কাঠামোর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করেছে।
এই স্থাপনার আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এর ‘অ্যারোডাইনামিক’ বা বায়ুগতিবিদ্যার প্রয়োগ। গোকুল মেধের উপরিভাগ সমতল নয়, ধাপযুক্ত। যখন কালবৈশাখী বা প্রবল ঝড় এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তখন এই ধাপগুলো বাতাসের বেগকে বাধা না দিয়ে বরং তাকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে দেয়। এর ফলে বাতাসের প্রচণ্ড চাপ সরাসরি স্থাপনার ওপর পড়তে পারে না। প্রাচীন বাংলার স্থপতিরা হয়তো বর্তমানের আধুনিক উইন্ড টানেল টেস্ট করতে পারতেন না, কিন্তু তাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল প্রখর। তারা নদীর গতিপ্রকৃতি আর বাতাসের দিক নির্ণয় করে বুঝতে পেরেছিলেন কীভাবে একটি স্থাপনাকে বাতাসের বিরুদ্ধে লড়াকু করে তোলা যায়। এই যে, বাতাসের সঙ্গে স্থাপনার মৈত্রী, এটিই গোকুল মেধকে শত শত ঝড়-তুফানের মধ্যেও অটুট রেখেছে।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই স্থাপত্যের সজ্জায় এক ধরনের ‘অ্যাকোস্টিক বা শব্দ প্রকৌশল’ কাজ করতো। যদিও এটি একটি ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক কেন্দ্র ছিল, কিন্তু এর কুঠুরিগুলোর বিন্যাস এমন ছিল যে, বাইরের কোলাহল ভেতরে খুব একটা পৌঁছাতো না। কুঠুরিগুলোর মাঝখানের দেয়ালগুলো একেকটি সাউন্ড ইনসুলেটর হিসেবে কাজ করতো। পাঠক যখন এই ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে দাঁড়ান, তখন তিনি এক ধরনের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা অনুভব করেন। ইটের সেই বিশেষ বিন্যাস শব্দতরঙ্গকে শোষণ করে নেয়। এটি ছিল তখনকার দিনের ধ্যান বা আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য এক উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রকৌশল।
পরিকল্পনার দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, গোকুল মেধ শুধু একটি বিচ্ছিন্ন টাওয়ার ছিল না। এটি ছিল মহাস্থানগড় বা প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের একটি বৃহত্তর আরবান প্ল্যানিংয়ের অংশ। এর উচ্চতাকে কাজে লাগিয়ে হয়তো একে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বা ‘ওয়াচ টাওয়ার’ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। মাটির ওপর থেকে ৪৩ ফুট উচ্চতা সেই সময়ে পুরো এলাকা নজরে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। অর্থাৎ, একটি স্থাপনা একই সঙ্গে মন্দির, ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময় এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতো। কারিগরদের এই মাল্টি-পারপাস থিঙ্কিং বা বহুমুখী চিন্তাভাবনা আজকের দিনের হাই-রাইজ কমপ্লেক্সগুলোর ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়।
গোকুল মেধ আমাদের শেখায় যে, স্থাপত্য মানে কেবল সুন্দর নকশা নয়, স্থাপত্য মানে হলো- নিজের চারপাশের মাটি, বাতাস আর পানির সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধুত্ব স্থাপন করা। সেই সময়ের কারিগররা মাটি থেকে মাটি তুলে এনেই এমন এক পাহাড় তৈরি করেছিলেন যা সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজও টিকে আছে। তারা জানতেন, অমরত্ব পেতে হলে পাথরের দরকার নেই, যদি ইটের গাঁথুনিতে সঠিক বিজ্ঞানের প্রয়োগ থাকে, তবে সামান্য মাটিও অমর হয়ে উঠতে পারে। পর্যবেক্ষকরা যখন এই কুঠুরিগুলোর দেয়াল স্পর্শ করেন, তখন তিনি স্পর্শ করেন এক প্রাচীন প্রজ্ঞাকে, যা আধুনিক ক্যালকুলেটর বা থিওরি ছাড়াই গড়ে তুলেছিল এক অপরাজিত মহাকাব্য।
খনন কার্যের বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ ও মাটির নিচের অমীমাংসিত রহস্য: গোকুল মেধ বা বেহুলার বাসরঘর যে আজ আমাদের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, এর পেছনে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিকদের বছরের পর বছর ধরে চালানো এক দীর্ঘ লড়াই। “আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার ১৯৩৪-৩৬ সালের নথি অনুযায়ী, প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ এন.জি. মজুমদারের (ননী গোপাল মজুমদার) খনন কার্যের মাধ্যমে এই স্থাপত্যের জ্যামিতিক রহস্য প্রথম জনসমক্ষে আসে।”
এন.জি. মজুমদারের নেতৃত্বে যখন এখানে প্রথম খনন কার্য শুরু হয়, তখন এটি ছিল স্রেফ এক বিশালাকার মাটির ঢিবি। পাহাড়ের মতো দেখতে সেই মাটির স্তূপ সরিয়ে ভেতরের ইটের কাঠামো বের করে আনা মোটেও সহজ কোনো কাজ ছিল না। প্রত্নতত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্ট্র্যাটিগ্রাফিক চ্যালেঞ্জ’। কারণ, এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকায় মাটির আর্দ্রতা আর লোনা ভাব ইটের ওপর একধরনের রাসায়নিক স্তর তৈরি করেছিল। সামান্য অসতর্কতায় পুরো কাঠামোটি ধসে পড়ার ঝুঁকি ছিল। কিন্তু সেই খনন কার্যই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো যে, রূপকথার আড়ালে এখানে লুকিয়ে আছে একটি সুপরিকল্পিত নগর সভ্যতার শেকড়।
খনন করতে গিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় পড়েছিলেন তা হলো এই ১৭২টি কুঠুরির তলদেশ খুঁজে বের করা। প্রতিটি কুঠুরি যখন খনন করা হচ্ছিল, তখন দেখা গেল একটার পর একটা ধাপ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির স্ক্যানার বা গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার (GPR) তখন ছিল না, ফলে হাতে চালানো কোদাল আর ব্রাশই ছিল ভরসা। এই খনন প্রক্রিয়ায় দেখা গেল, স্থাপনাটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি বর্গাকার কক্ষ, যার মাঝখানে ছিল একটি পাথরের স্ল্যাব। এই স্ল্যাবটি মূলত একটি শৈব মন্দিরের অংশ ছিল। কিন্তু বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই মন্দিরের নিচেও পাওয়া গেছে আরও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ। অর্থাৎ, গোকুল মেধ কোনো একক সময়ের সৃষ্টি নয়; এটি একটি ‘মাল্টি-লেয়ার্ড’ স্থাপনা। একটি প্রাচীন ভিত্তির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের নিজস্ব স্থাপত্য গড়ে তুলেছে। এটি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, কীভাবে একটি পুরনো ও দুর্বল ভিত্তিকে না সরিয়ে তার ওপর আরও ভারী নতুন কাঠামো দাঁড় করানো যায়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে গোকুল মেধ নিয়ে আমাদের গবেষণা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। বরং আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর ভেতরকার রহস্যগুলো আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে। সামপ্রতিককালের প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, এই ১৭২টি কুঠুরির সবক’টিই কি কেবল ভরাট করা হয়েছিল? নাকি এর মধ্যে কোনো গোপন সুড়ঙ্গ বা চলাচলের পথ ছিল যা কালক্রমে মাটির চাপে বন্ধ হয়ে গেছে? এখনো এই স্থাপনার অনেক অংশ মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে যা খনন করা সম্ভব হয়নি। আধুনিক লেজার স্ক্যানিং বা থ্রি-ডি মডেলিংয়ের মাধ্যমে যদি পুরো গোকুল মেধের একটি ম্যাপ তৈরি করা যায়, তবে হয়তো দেখা যাবে এই কুঠুরিগুলোর বিন্যাসের পেছনে কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞান বা নাক্ষত্রিক হিসাব কাজ করতো। কারণ প্রাচীনকালে অনেক ধর্মীয় স্থাপনা নক্ষত্রের অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা হতো, যা আমরা মিশরীয় পিরামিড বা মায়া সভ্যতার মন্দিরে দেখতে পাই।
ভবিষ্যতের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনা হিসেবে ‘গোকুল মেধ’ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ল্যাবরেটরি। এখানে ব্যবহৃত ইটের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করলে আমরা জানতে পারবো সেই সময়কার মাটির ক্ষয়রোধ করার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তারা ঠিক কী ধরনের জৈব পদার্থ ব্যবহার করতো। আজকের যুগে যখন আমরা টেকসই বা ‘সাস্টেইনেবল’ নির্মাণের কথা বলি, তখন গোকুল মেধের এই প্রাচীন ফর্মুলা আমাদের নতুন পথ দেখাতে পারে। এছাড়াও, এই স্থাপনার চারপাশে যে বিশাল পরিখা বা গর্তের চিহ্ন পাওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করলে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন নগরের পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
পর্যবেক্ষকরা যখন গোকুল মেধের সিঁড়িতে পা রাখেন, তাকে বুঝতে হবে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এক বিশাল ডেটাবেজের ওপর। এই ইটের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে পাল বংশ, সেন বংশ এবং তারও আগের রাজবংশগুলোর উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী। খনন ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, যা হারিয়ে গেছে তা চিরতরে শেষ হয়ে যায়নি; তা কেবল মাটির নিচে অপেক্ষা করছে সঠিক সময়ের আর সঠিক প্রযুক্তির। গোকুল মেধের এই অসমাপ্ত খননই আমাদের আগামীর গবেষকদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। রূপকথার বেহুলা হয়তো সাপের হাত থেকে তার স্বামীকে বাঁচাতে লোহার বাসরঘর বানিয়েছিলেন, কিন্তু ইতিহাসের কারিগররা আমাদের জন্য রেখে গেছেন ইটের তৈরি এক অমর লাইব্রেরি, যার প্রতিটি ইট এক একটি অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান বয়ে বেড়াচ্ছে।
মহাকালের দর্পণে এক অপরাজিত ইঞ্জিনিয়ারিং মহাকাব্য: গোকুল মেধ বা আমাদের অতি পরিচিত ‘বেহুলার বাসরঘর’ আমরা যাকে নিছক একটি কিংবদন্তির ধ্বংসাবশেষ মনে করি, তা আসলে প্রাচীন বাংলার এক নীরব বিপ্লব। সপ্তম শতাব্দীর সেই নাম না জানা কারিগররা আমাদের জন্য রেখে গেছেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক জীবনদর্শন। আজকের আধুনিক বাংলাদেশে আমরা যখন বড় বড় মেগা প্রজেক্ট নিয়ে গর্ব করি, তখন ১৩০০ বছর আগে মহাস্থানগড়ের এই প্রান্তরে বসে যে স্থপতিরা ১৭২টি কুঠুরির ‘সেলুলার গ্রিড’ সাজিয়েছিলেন, তাদের দূরদর্শিতা আমাদের নতুন করে বিনয়ী হতে শেখায়।
গোকুল মেধের স্থাপত্য কৌশল প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বাংলার মানুষ মাটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্থাপনার ভার বণ্টন বা ‘লোড ডিস্ট্রিবিউশন’ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখতেন। কোনো স্থাপনা কেবল ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত আবেগে টিকে থাকে না, তার টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন নিখুঁত জ্যামিতি আর রসায়নের সমন্বয়। লোকগাথা আর প্রত্নতত্ত্বের এই যে লড়াই, যেখানে ইতিহাস বলছে, এটি একটি সুউচ্চ মন্দির বা বৌদ্ধ স্তূপ, আর জনমানুষের বিশ্বাস বলছে এটি বেহুলার বাসরঘর, এই দ্বন্দ্বই স্থাপনাটিকে একটি অনন্য রহস্যময় মাত্রা দান করেছে।
তবে গোকুল মেধের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হলো ‘সাসটেইনেবিলিটি’ বা স্থায়িত্ব। আজ আমরা যে কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করি, যার স্থায়িত্ব বড়জোর ১০০ বছর, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই স্থাপনাটি ১৩০০ বছর ধরে প্রকৃতির প্রতিটি আঘাত সয়ে নিয়েছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির চরম শিখরে পৌঁছেও আমরা হয়তো প্রকৃতির ভাষা বুঝতে অনেক সময় ভুল করি। গোকুল মেধের সেই চুন-সুরকির গাঁথুনি আর ইটের পর ইটের জ্যামিতিক আলিঙ্গন আমাদের শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করেই দীর্ঘস্থায়ী কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব। এই স্থাপনাটি আসলে একটি সেতু, যা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে।
উপসংহারে বলা যায়, গোকুল মেধ বগুড়ার একটি পর্যটন কেন্দ্র। এটি একটি জীবন্ত পাঠশালা। প্রতিটি ইটের ভাঁজে ভাঁজে এখানে ঘুমিয়ে আছে বাংলার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আদি পাঠ। আমরা যখন এই ঢিবির চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারদিকের সবুজ দিগন্ত দেখি, তখন আমাদের অনুভব করা উচিত যে, আমরা আসলে দাঁড়িয়ে আছি আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রজ্ঞার ওপর। বেহুলার বাসরঘরের রূপকথা হয়তো মানুষের মুখে মুখে আরও কয়েক হাজার বছর বেঁচে থাকবে, কিন্তু তার বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা সেই ১৭২টি কুঠুরির ইঞ্জিনিয়ারিং সত্যটি গবেষক আর চিন্তাশীল মানুষের কাছে চিরকাল এক অমীমাংসিত বিস্ময় হয়েই থাকবে।
মহাকালের এই দীর্ঘ ভ্রমণে অনেক রাজবংশ বিলীন হয়েছে, পাল্টে গেছে মানচিত্র, কিন্তু গোকুল মেধ তার জায়গায় অটল। এটি আমাদের অস্তিত্বের এক দৃঢ় স্থাপত্যিক ঘোষণা। এই ঘোষণার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই আমাদের আগামীর স্থাপত্য পরিকল্পনা সাজানো উচিত। যেখানে বিজ্ঞানের কঠোরতা থাকবে, কিন্তু হৃদয়ে থাকবে নিজের মাটি আর ঐতিহ্যের প্রতি গভীর মমতা। গোকুল মেধ আমাদের সেই মমতারই এক অমর প্রতীক। ভবিষ্যতেও থাকবে এক অপরাজিত মহাকাব্য হিসেবে।
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:
১. প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিবেদন ও আকর গ্রন্থ (Primary & Key Sources):
Archaeological Survey of India (ASI) Annual Report- (১৯৩৪-৩৫- ১৯৩৫-৩৬): ননী গোপাল মজুমদার (N.G. Majumdar) পরিচালিত গোকুল মেধের খননকার্যের মূল দাপ্তরিক বিবরণ।
মহাস্থান: একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দেশিকা ড. নাজিমুদ্দিন আহমেদ (প্রাক্তন পরিচালক, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর)। গোকুল মেধের ‘সেলুলার কনস্ট্রাকশন’ বা মৌচাক সদৃশ ভিত্তির বিস্তারিত বর্ণনা এখানে পাওয়া যায়।
বগুড়ার ইতিহাস- প্রভাসচন্দ্র সেন। এই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝার আদি আকর।
২. আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি (Local Research):
বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা: বগুড়া (২০১৪) প্রধান সমন্বয়কারী: ড. বেলাল হোসেন। (বাংলা একাডেমি প্রকাশিত)। এই গ্রন্থে গোকুল মেধের লোকজ তাৎপর্য এবং বগুড়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিশদ বিবরণ রয়েছে।
পূর্ব বগুড়া: লোকসাহিত্যের কাঠামো ও স্বাতন্ত্র্য (২০০৮) ড. বেলাল হোসেন। এই বইটি এই অঞ্চলের লোকগাথা (যেমন বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর মিথ) ও ঐতিহ্যের বিবর্তন বুঝতে সহায়ক।
পুণ্ড্রনগর থেকে মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সংকলন।
৩. সাহিত্যিক ও মিথলজিক্যাল উৎস (Literary Context):
পদ্মপুরাণ (১৭৪৪ খ্রি.) কবি জীবন মৈত্র। গোকুল মেধকে লোকমানসে ‘বেহুলার বাসরঘর’ হিসেবে অমর করে তোলার প্রধান সাহিত্যিক ভিত্তি।
মনসামঙ্গল কাব্য বিপ্রদাস পিপিলাই ও অন্যান্য।
৪. টেকনিক্যাল ও ডিজিটাল রেফারেন্স (Technical Analysis):
Ancient Monuments of Bengaly অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়। প্রাচীন বাংলার নির্মাণ উপকরণ ও প্রকৌশলগত বিশ্লেষণ।
বাংলাপিডিয়া- বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। ‘গোকুল মেধ’ ও ‘মহাস্থানগড়’ সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ও কালানুক্রমিক তথ্য।
Structural Studies of Historical Buildings আন্তর্জাতিক জার্নাল। ঐতিহাসিক স্থাপনার ভার বণ্টন ও ফাউন্ডেশন ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত তাত্ত্বিক ধারণা।
