মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চলমান পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেয়া এবং নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি। পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও সম্পর্কের কৌশল নির্ধারণেও নতুন করে ভাবতে হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে ‘ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ (এফএসডিএস) আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এমন মত দেন। ‘বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইরানের টিকে থাকা: অসম সহনশীলতা, আঞ্চলিক পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক বিপর্যয়ের যুক্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এফএসডিএসের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এফএসডিএসের প্রিন্সিপাল রিসার্চ ফেলো ও সেক্রেটারি জেনারেল ড. ইশারফ হোসেন। আলোচনায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. শাফায়াত আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান, নিউ নেশনের সাবেক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) একেএম হুমায়ুন কবীর, ওসমানী সেন্টারের পরিচালক কমোডর (অব.) মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার এডমিরাল মোস্তাফিজুর রহমান, এয়ার কমোডর (অব.) শফিকুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মঞ্জুর কাদের, এআইইউবি’র রেজিস্ট্রার অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন ড. জাহিদুল ইসলাম খান, সাংবাদিক সাবেদীন ইব্রাহিম, তরুণ রাজনীতিবিদ ও গবেষক আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, আইপিজিএডি’র রিসার্চ ফেলো সৈয়দ রাইয়ান আমির, আইইউবি’র শিক্ষক ও গবেষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান এবং এফএসডিএসের গবেষণা সহকারী মো. মিনহাজুল ইসলাম ।
আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধাবস্থার আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে গভীর গবেষণা ও দায়িত্বশীলতার ওপর বক্তারা জোর দেন। তারা মনে করেন, পররাষ্ট্রনীতিকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির উদাহরণ তুলে ধরে তারা বলেন, তার কূটনীতির মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া, যা বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক। বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণে রাষ্ট্রের অনিবার্য বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। শুধুমাত্র জনসমর্থন বা জনদাবির কারণেই রাষ্ট্র সবসময় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে না; এখানে কৌশলগত বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অসম যুদ্ধকে বক্তারা তিনটি প্রধান প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করেন ভূ-রাজনীতি, ভূ-অর্থনীতি এবং সভ্যতার সংঘাত। সভ্যতার সংঘাতের ক্ষেত্রে ইরানের ইসলামী রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। মুসলিম বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে, অসম এই যুদ্ধে সামরিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে ইরানের অনমনীয় ও দৃঢ় অবস্থান থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে বলে মত দেন তারা। এখানে জনগণের নৈতিক দৃঢ়তা, ঐক্য ও দেশপ্রেম একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে।
বক্তারা মালদ্বীপের উদাহরণ টেনে বলেন, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশটির পার্লামেন্ট ইসরাইলি নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাদের সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত। দেশের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো নিয়েও সমালোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, আমলারা বর্তমানে নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন না, ফলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে জনগণকে পররাষ্ট্রনীতির বাইরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অভাবকে দেশের কূটনৈতিক দুর্বলতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
