ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন প্রধান ইভাসরস ইজাবস বলেছেন, সত্যিকার অর্থে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতার সঙ্গে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেছে। তবে অপতথ্য নির্বাচনে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি। শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক মূল্যায়নে তিনি এসব কথা বলেন। ইইউ মিশন প্রধান বলেন, ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য নতুন বেঞ্চমার্ক।
নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা স্বাধীনভাবে প্রচার করতে পারলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছিল বলে মনে করে ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন। নারী প্রার্থীর স্বল্পতা, বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা, অনলাইনে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এবং কিছু প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইইউ মিশন।
এটি গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ: ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস মনে করেন সদ্য সমাপ্ত সংসদীয় নির্বাচনটি গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের ’২৬-এর নির্বাচনটি সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক ছিল, একটি নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়েছে; যা মূলত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মৌলিক স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে মর্যাদাপূর্ণ করে। বিক্ষিপ্ত স্থানীয় রাজনৈতিক সহিংসতা, যাইহোক না কেন, প্রায়শই ম্যানিপুলেটেড অনলাইন আখ্যান দ্বারা সৃষ্ট হয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে ও স্বচ্ছভাবে স্টেকহোল্ডারদের আস্থা বজায় রেখে এবং নির্বাচনের অখণ্ডতা সমুন্নত রেখে কাজ করেছে। মিশনটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, নির্বাচনী আইনি কাঠামো গণতান্ত্রিক নির্বাচন পরিচালনার জন্য পরিচালিত হয় এবং ২০২৫ সালের সংশোধনী অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে শক্তিশালী করে। আইনি নিশ্চয়তা বাড়ানোর জন্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা হ্রাস করে এমন ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করার জন্য আরও সংস্কার প্রয়োজন।
ইইউ মিশন প্রধান বলেন, আমরা দেখেছি, সদ্য নিযুক্ত নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য একটি সক্রিয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে এবং আমরা লক্ষ্য করেছি, অন্তর্বর্তী সরকার এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররা কমিশনকে যে সমর্থন দিয়েছিলেন কমিশন স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করেছে, সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রশ্নের দ্রুত জবাব দিয়েছে, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য ভাগ করে নিয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছে।
ইভার্স ইজাবস বলেন, নারীরা জুলাই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিলেও নির্বাচনে তাদের উপস্থিতি মাত্র ৪ শতাংশ। ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি, বৈষম্য হয়েছে নারীদের সঙ্গে। জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার স্পষ্ট অভাব লক্ষ্য করা গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের বাদ দেয়ার পুরনো প্রথা এখন পরিত্যাগ করার সময় এসেছে। প্রচারণার সময় ভীতি প্রদর্শন এবং বিশেষ করে নারী প্রচারকদের হয়রানি করার ঘটনা ঘটেছে।
ইইউ আরও বলেন, ৫৬টি প্রচারণা সংক্রান্ত সহিংস ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে শারীরিক আঘাত এবং প্রাণহানির মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। কারসাজি করা অনলাইন বর্ণনা বা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকে দেয়া হয়েছে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ক্ষতি করে। ভুল তথ্য বা অপপ্রচার রোধে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলো খুব ধীরগতিতে পদক্ষেপ নিয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণও হতাশাজনক। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের ধৈর্য এবং শান্ত ব্যবহারকে আমরা স্বাগত জানাই। নতুন সরকারের মানবাধিকার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সমর্থকদের সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং সুশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আরও কাজ করা প্রয়োজন।
