৬ মাস বয়স। নাকে পাইপ লাগানো। এটা দিয়েই খাওয়ানো হয় দুধ। বাবা-মা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন। বারবার নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছেন, কান্না করলে খাওয়াবো কীভাবে? ছেলের এই অবস্থা দেখে নিজেদের চোখের পানি লুকাচ্ছিলেন সোহেল ভূঁইয়া ও রুমী আক্তার দম্পতি। তাদের প্রথম সন্তান হৃদয়। গাজীপুরে ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালান সোহেল। ছেলেকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসা করাচ্ছেন। ৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছেন। ধারদেনা করে খরচ করেছেন অন্তত ৫ লাখ টাকা। সরজমিন রাজধানীর শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম ওয়ার্ডে দেখা গেছে সন্তান নিয়ে অনেক মা-বাবার এমন চাপাকান্না। শনিবার দুপুর ১১টা থেকে রোববার দুপুর ১১টা পর্যন্ত ১২ জন হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে ১০ জন। আগে থেকে ভর্তি ছিল ৬৭ জন। সবমিলিয়ে বর্তমানে ৬৯ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। ভুক্তভোগী সোহেল ভূঁইয়া বলেন, হঠাৎ ছেলের জ্বর, কাশি শুরু হয়। ২ দিন পর গলা বন্ধ হয়ে যায়। কান্নার শব্দও বের হচ্ছিল না। পরে ডাক্তার বলেন, নিউমোনিয়া হয়েছে। এরপর গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে ডাক্তার বলেন, অবস্থার উন্নতি না হলে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। এরপর সেখান থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে কয়েকদিন রাখার পর পিআইসিইউতে রাখার জন্য বলা হয়। কুর্মিটোলায় পিআইসিইউ না থাকায় ধানমণ্ডির একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৭ দিন পিআইসিইউতে রাখা হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত ১৬ই মার্চ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি করাই। তিনি বলেন, নিউমোনিয়া ভালো হয়ে গেলে ২রা এপ্রিল ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে যাই। দুইদিন পর দেখি শরীরে লাল লাল দাগ। ফের ছেলের ঠান্ডা, কাশি, জ্বর দেখা দেয়। এরপর এখানে এসে ডাক্তারকে দেখাই। জানানো হয়, হামে আক্রান্ত হয়েছে। পরে ৫ই এপ্রিল হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ১৩ দিন ছেলেকে অক্সিজেন দিতে হয়েছে। এ অবস্থায় নল দিয়ে খাওয়াতে হয়েছে। শনিবার ডাক্তার অক্সিজেন খুলে দেয়। তবে এখনো নল দিয়েই খাওয়াতে হচ্ছে। সোহেল বলেন, এখন হামের সমস্যা নেই। কিন্তু নিউমোনিয়া ভালো হয়নি। ডাক্তার বলেছে, এ ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে দেয়া হবে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমার অন্তত ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। টাকা ধারদেনা করেছি। গাজীপুরে ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চলাই। এতদিন ট্যাক্সি চালাতে পারিনি।
ওই ওয়ার্ডে আয়েশা আক্তার নামে ৮ মাসের এক শিশুও চিকিৎসা নিচ্ছে। ময়মনসিংহ থেকে আসা এই শিশুকে ১৪ দিন আইসিইউতেও রাখা হয়েছিল। এখন অনেকটা উন্নতির দিকে। তবে এখানে ভর্তি করানোটা সহজ ছিল না রোগীর চাপের কারণে। শিশুটির খালা শাহনাজ বেগম মানবজমিনকে বলেন, ঠান্ডাজনিত কারণে আয়েশাকে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ধরা পড়ে হাম। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলে। এরপর ১ মাস ধরে অপেক্ষা করে এখানে সিট পাই। ১৪ দিন আইসিইউতে রাখা হয়। এখন অনেকটা উন্নতি হয়েছে। এখানো সরাসরি খাবার দেয়া হয়নি। শুধু সেলাইন চলছে। তিনি বলেন, আয়েশার মা বর্তমানে পাগলপ্রায় অবস্থায়। খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। এজন্য সংসার ফেলে আমাকেও আসতে হয়েছে। জানি না কতোদিনে পুরোপুরি সুস্থ হবে। একই ওয়ার্ডে ৫ মাস ২২ দিন বয়সী ছেলে জিসানকে নিয়ে চুপচাপ বসে ছিলেন সুজন ইসলাম ও সোনিয়া আক্তার দম্পতি। বরিশাল থেকে রাজধানীতে এসে সন্তানের চিকিৎসা করাচ্ছেন। শনিবার নাক থেকে অক্সিজেন খুলে দিয়েছে। ছেলে আগের থেকে অনেকটা ভালো। কিন্তু তবুও ভেতরে কষ্ট লুকিয়ে আছে। মনের কথাগুলোও বলার মতো কেউ নেই। বরিশাল সদর এলাকায় বসবাস করেন। ভ্যান ঠেলে আলু, পিয়াজ বিক্রি করে সংসার চালান সুজন ইসলাম। তিনি মানবজমিনকে বলেন, প্রথমে ছেলের ঠান্ডা জ্বর হয়। এরপর শ্বাসকষ্ট। অবস্থার উন্নতি না দেখে বরিশালের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করি। সেখানে দুইদিন রাখার পর বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় তাকে অক্সিজেন আর সেলাইন দেয়া হয়। শ্বাসকষ্ট বেশি থাকায় ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য বলা হয়। এরপর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করি। ৬ দিন থেকে এখানে ভর্তি। রোববার বেলা ১২টার দিকে ছেলের অক্সিজেন খুলে দিয়েছে। সুজন ইসলাম বলেন, সামান্য ব্যবসা। ভ্যান ঠেলে আলু আর পিয়াজ বিক্রি করি। কতো টাকা আর আয় করি? কিন্তু ছেলের চিকিৎসার পেছনে অনেক টাকা চলে যাচ্ছে। ঢাকায় ৬ দিনে আমার ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। নিজের জমানো টাকা বলতে কিছু নাই। ব্যবসার যা টাকা ছিল, সব খরচ করেছি। এখন টাকা ধার করে চিকিৎসা করাচ্ছি।
উল্লেখ্য, রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামে এক শিশু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত হামে মোট ৩৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮১ শিশুর।
