চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৪১১ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ সম্পদ জব্দ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শুধু জব্দ নয়, অনেক সম্পদ ফ্রিজও করেছে সংস্থাটি। আদালতের আদেশে এসব স্থাবর, অস্থাবর ও বিদেশে গড়ে ওঠা সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক। সম্প্রতি সংস্থাটির জনসংযোগ দপ্তর থেকে সংগ্রহ করা প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে মার্চ ও চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত কমিশন গঠন না হওয়ার কারণে কোনো সম্পদ জব্দের আবেদন করা হয়নি।
আদালতের বিভিন্ন আদেশে গত জানুয়ারি মাসে দেশে ও বিদেশে মোট ২ হাজার ২৭১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করে দুদক। সংস্থাটি জানায়, জানুয়ারি মাসে আদালতের ২৯টি আদেশের ভিত্তিতে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তালিকা কমিশনে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি আদেশে সম্পদ ক্রোক এবং ১১টি আদেশে সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। মাসিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ৬৯ দশমিক ২৬ একর জমি, ৪টি ভবন, ৬টি ফ্ল্যাট, ২টি দোকান, ১টি বাণিজ্যিক স্পেস, ১টি এফডিআর, ৬টি গাড়ি ও ১টি বীমা পলিসি ক্রোক করা হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশে ক্রোক হওয়া সম্পদের মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৬৯ লাখ ৭৮ হাজার ৬২৩ টাকা। এ ছাড়া ৭৯টি ব্যাংক ও সঞ্চয়ী হিসাবে মোট ৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯১৩ টাকা স্থিতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ২টি বিও হিসাব ও ১২ লাখ টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এতে দেশে অবরুদ্ধ সম্পদের সম্মিলিত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার ৩১৩ টাকা।
একাধিক দেশে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৪টি ফ্ল্যাট, ফিলিপাইনে ২টি ফ্ল্যাট ও ভারতে ৯টি ফ্ল্যাট ক্রোক করা হয়েছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় ৪৭টি বাণিজ্যিক স্পেস, কম্বোডিয়ায় ১১৭টি সম্পদ, থাইল্যান্ডে ২৩টি সম্পদ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫৯টি সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে ৩৩টি অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোক করা হয়েছে। বিদেশে ক্রোক ও অবরুদ্ধ এসব স্থাবর সম্পদের মোট মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ হাজার ২১৬ কোটি ৬৮ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৩ টাকা ২০ পয়সা। ১ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগও ক্রোক করা হয়েছে, যার বাংলাদেশি মূল্য ১ কোটি ২২ লাখ ২৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৪৬৭ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৭৬টি এফআইআর (এজাহার), ১১০ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৬টি চার্জশিট, ১১ জন ব্যক্তিকে অব্যাহতি দিয়ে ৯টি এফআর (ফাইনাল রিপোর্ট), ৯২টি নতুন অনুসন্ধান, ১৯টি পরিসমাপ্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি ও ৩৮টি সম্পদ বিবরণীর আদেশ জারি করা হয়। এদিকে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে আদালতের আদেশে বিভিন্ন মামলায় স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট ১৪০ কোটি ৭৭ লাখ ২৬ হাজার ৪১০ টাকার বেশি টাকার সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। দুদক সূত্রে জানা যায়, ক্রোক কিংবা অবরুদ্ধ করা সম্পদের মধ্যে ৭২ কোটি ৪৭ লাখ ৯৯ হাজার ৬০১ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৭০ কোটি ২৯ লাখ ২৬ হাজার ৮০৯ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। আদালতের ২৯টি আদেশে ওই সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয় বলে জানা গেছে। আরও জানা যায়, আদালতের আদেশে ক্রোক করা স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৫৬.৫৮৯৯ একর জমি, ১৫টি ভবন, ২৮টি ফ্ল্যাট, ১২টি প্লট, ২টি টিনশেড ঘর, ১টি খেলার মাঠ, ১টি স্কুল, ২টি দোকান ও ৬টি গাড়ি। অন্যদিকে ১৫টি আদালতের আদেশে অস্থাবর সম্পদের তালিকায় রয়েছে ব্যাংক হিসাব, নগদ অর্থ, এফডিআর, শেয়ার, প্রাইজ বন্ডসহ বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ। অবরুদ্ধকৃত অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১৪৪টি ব্যাংক হিসাবের ৫৯ কোটি ৯২ লাখ ১০ হাজার ৪৬৫ টাকা, ৫ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার ২২২ টাকার বিনিয়োগ, ১৩ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ১ কোটি ৫২ লাখ ২৪ হাজার টাকার পে-অর্ডার, ৮৮ লাখ ৭০ হাজার এফডিআর, ৫০ লাখ টাকার শেয়ার ও ৯৩ লাখ ১৬ হাজার টাকার বিও হিসাব রয়েছে। জব্দকৃত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কমিশনের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট নিয়মিত তদারকি করছে দুদক।
এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বিভিন্ন অনুসন্ধান ও মামলার প্রেক্ষিতে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এসব স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট, ভবন ও অন্যান্য স্থায়ী সম্পদ। তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ মার্চ মাসেও অনেক প্রতিবেদন তদন্তকারী কর্মকর্তারা শেষ করে বসে আছেন। কমিশন না থাকায় এসব তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতির সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পদ জব্দ, অবরুদ্ধকরণসহ নানা কার্যক্রমের পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না। এ সময় নতুন কমিশন গঠন হলে আবারো নিয়মিত কাজে গতি পাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন আকতারুল ইসলাম।
এর আগে, ২০২৫ সালে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধে রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছিল দুদক। দেশে ও বিদেশে দুর্নীতিবাজ, অর্থ পাচারকারী, সরকারি লোপাটকারী এবং ঋণখেলাপিসহ সাড়ে ৩০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৮ হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করে। আর ২০২৪ সালের পুরো সময়ে ক্রোক ও অবরুদ্ধের পরিমাণ ছিল ৩৬১ কোটি টাকা।
দুই মাসে ২৪১১ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ
মারুফ কিবরিয়া
১৯ এপ্রিল (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
