আগামী জানুয়ারিতেই কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর চিন্তা

আগামী জানুয়ারিতেই কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর চিন্তা

ফন্ট সাইজ:

তিন দফায় সংশোধন হয়েছে মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-৬ এর প্রকল্প। সর্বশেষ গত বছরের শেষে প্রকল্প সংশোধন করে কমানো হয়েছে ব্যয়। তবে বেড়েছে অপেক্ষার প্রহর। গত বছরের ৩১শে ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ফের ৩ বছর বাড়ানো হয়েছে মেয়াদ। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তিন বছরের আগেই ট্রেন চালানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ চলতি বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হবে কাজ। সেই প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। বাণিজ্যিকভাবে যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করতে আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত গড়াতে পারে।
মেট্রোরেলের লাইন কমলাপুর পর্যন্ত নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় পরে। শুরুতে মতিঝিল পর্যন্ত যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এর আগে আগারগাঁও পর্যন্ত চালু হয়। কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২০২২ সালে। উড়ালপথ ও কমলাপুরে স্টেশন নির্মাণকাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয় ২০২৩ সালে। এমআরটি লাইন-৬ এর চুক্তি অনুসারে, গত বছরের জুন মাসে এ কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে কাজের গতি কম হওয়ায় সেটি ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবুও শেষ করা যায়নি কাজ। সবশেষ খরচ কমিয়ে তৃতীয়বার প্রকল্প মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে, প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের আগেই কমলাপুর অংশে ট্রেন চালানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। যাত্রীদের জন্য ওই পথ উন্মুক্ত হবে আগামী বছরে শুরুতে। তার আগে চলবে ট্রেনের ট্রায়াল রান। তবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ডিনপি পিরিয়ডসহ মেয়াদ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এই সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার পর যদি কোনো ত্রুটি ধরা পড়ে, তাহলে ঠিকাদারকে সেটা নিজ দায়িত্বে ঠিক করতে হবে।
কেন বাড়লো সময়: মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশে মেট্রোরেলের কাজে জট লেগে যায়। বিশেষ করে ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে। গত বছর রেললাইন, বৈদ্যুতিক ও সংকেতব্যবস্থা স্থাপনসহ অন্যান্য কাজে ঠিকাদার বাড়তি ব্যয় দাবি করার কারণে জটিলতা শুরু হয়। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করার বিষয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিশেষ করে ওই লাইনের সিভিল সেকশনের কাজ নিয়মিত চললেও মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় দীর্ঘদিন। সে সময় ডিএমটিসিএল সূত্রগুলো মানবজমিনকে জানায়, উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশে যে ঠিকাদার এবং যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশেও একই প্রযুক্তির ব্যবহার করা প্রয়োজন। মেট্রোরেলের সবগুলো স্টেশনের জন্য এক রকম ব্যবস্থা। তাই নতুন করে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিলে ভিন্ন সার্ভার, নতুন অপারেশনাল সিস্টেম, ভিন্ন ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির কারণে ট্রেন অপারেশনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। ফলে বিদ্যমান ঠিকাদার দিয়েই অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অংশের কাজ করানো জরুরি হয়ে পড়ে। মূলত আগে ঠিকাদারকে নিয়োগ দেয়া হলে খরচ বেড়ে যাচ্ছিল অনেক। তাই এই জটিলতা কাটাতেই অনেক সময় লেগে যায়। এ বিষয়ে সে সময় প্রকল্পটির পরিচালক মানবজমিনকে জানান, আগের ঠিকাদাররের সঙ্গে চুক্তি করতে গেলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা খরচ কমানোর জন্য দর কমানোর জন্য চেষ্টা করছেন বলেও জানান। উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশে রেললাইন, বৈদ্যুতিক ও সংকেতব্যবস্থা স্থাপনসহ অন্যান্য কাজ করেছে যৌথভাবে জাপানের মারুবিনি করপোরেশন এবং ভারতের লারসন অ্যান্ড টুবরো। বর্ধিত অংশও তাদের মাধ্যমে করার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ঠিকাদারের বেশি দর প্রস্তাবের বিষয়টি ফের সামনে আসলে শুরু হয় দরকষাকষি। শেষ পর্যন্ত মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের জন্য দরকষাকষির পর তৃতীয় মেয়াদে সংশোধন করা হয় প্রকল্পটি। গত ১লা ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি- একনেকের ৬ষ্ঠ একনেক সভায় উঠে মেট্রোরেলের এমআরটি-৬ প্রকল্প। এতে প্রায় ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানো হয়। অর্থাৎ, ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল এতে। কিছু খাতে ব্যয় কমেছে। বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণে। তবে পরামর্শক ফি ও কয়েকটি প্রযুক্তিগত খাতে ব্যয় বেড়েছে। সব সমন্বয় শেষে মোট ব্যয় ৭৫৪ কোটি টাকা কমে গেছে। আবার প্রকল্পের সময়সীমা বাড়ানো এবং নকশা সংশোধনের কারণে কয়েকটি খাতে ব্যয় বেড়েছে।
সরজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মতিঝিল স্টেশন থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ভায়াডাক্ট, পিয়ার, স্টেশন কলামসহ সিভিলের কাজগুলো প্রায় শেষ। তবে, লাইনগুলোর বাউন্ডারি পুরোটা শেষ হয়নি। শাপলা চত্বর থেকে সেনাকল্যাণ ভবন পার হয়ে আরও প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত দূরত্ব লাইনের পাশে বাউন্ডারি তৈরি করা হয়েছে। কমলাপুর মূল স্টেশনের ছাউনি বসানো শেষ হয়েছে। ছাউনির ভেতর সিভিল, ইলেক্ট্র- মেকানিক্যালসহ সকল সেকশনের কাজ চলছে। তবে, মূল লাইন দৃশ্যমান হবে রেলে পাত বসানোর পর।
প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের সূত্রে জানা গেছে, ওই লাইনের সিভিল সেকশনের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশই শেষ। মেকানিক্যালের কাজ কেবল শুরু হয়েছে। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শেষ। মেকানিক্যাল অংশের কাজের মধ্যে রয়েছে- ফায়ার ফাইটিং পাইপ, ফ্লাম্বিং, ড্রেনেজ, ওয়াটার সাপ্লাই, এসি এবং ভেন্টিলেশনের কাজ। প্রকৌশলীরা বলছেন, মেকানিক্যাল সেকশনের কাজ ১ বছর টার্গেট হলেও এই বছর শেষ করা যায় কি না অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে পিছিয়ে আছে ইলেকট্রিক্যাল অংশের কাজ। সিগন্যালিং অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। ওদিকে, গত ৩১শে মার্চ পর্যন্ত কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৭৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১.১৬ কিলোমিটারের মার্চ মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদনে ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, ৩১শে মার্চ পর্যন্ত সকল পাইলক্যাপ, পিয়ার এবং সকল স্টেশন কলাম নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। উত্তরা কন্সস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে ২৯৮টি প্রিকাস্ট সেগমেন্টের মধ্যে শতভাগ প্রিকাস্ট সেগমেন্ট কাস্টিং সম্পন্ন হয়েছে। মোট ২৭টি স্প্যানের মধ্যে ২৫টি স্প্যান উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে। মোট ১৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের কনকোর্স ছাদের মধ্যে ১৮০ মিটার, ১৮০ মিটার ট্র্যাক স্ল্ল্যাবের মধ্যে ১৮০ মিটার ট্র্যাক স্ল্যাব এবং ১৮০ মিটার প্ল্যাটফরম স্ল্যাবের মধ্যে ১৮০ মিটার প্ল্যাটফরম স্ল্যাব ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ৮২৪টি প্রিকাস্ট প্যারাপেট ওয়ালের মধ্যে সকল প্রিকাস্ট প্যারাপেট ওয়াল তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। স্টেশনের স্টিল রুফ স্ট্রাকচার এর ৫৩৩ টন স্টিলের মধ্যে ৪৯৯ টন স্টিল ইরেকশনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কনকোর্স লেভেলের ২৮০০ বর্গমিটার ব্রিক ওয়াল ও প্লাস্টারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্টেশনের আর্কিটেকচারাল এবং এন্টি-এক্সিটের কাজ চলমান রয়েছে। এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব মানবজমিনকে বলেন, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের কাজ ৭৫ শতাংশ হয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে। আমাদের পরিকল্পনা আছে আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নাগাদ এটা চালু করে দেব।
কাজের অগ্রগতি জানিয়ে তিনি বলেন, সিভিলের কাজ মোটামুটি ৯০ শতাংশ হয়ে গেছে। ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজ একটু পেছনে আছে। এটা হয়তো ৫০-৬০ শতাংশ হয়েছে। ভায়াডাক্ট লাগানো হয়েছে, এখন ট্র্যাক লাগানো শুরু হবে এই মাসের ১৫ তারিখ থেকে। তারপরে সিগন্যালিংয়ের পোস্ট ইত্যাদি বসানো হবে। সিগন্যালিংয়ের ইকুইপমেন্ট আসবে হয়তো জুলাই-আগস্টের দিকে।
২ মাস চলবে ট্রায়াল রান: সরকার ২০২২ সালে মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশের ১৫ দিন ট্রায়াল রানের কথা জানিয়েছিল তখন। তবে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশে ২ মাসের মতো চলবে ট্রায়াল রান। সমন্বিতভাবে উত্তরা থেকে কমলাপুর অংশে চলবে ট্রায়াল রান। ফলে এই ২ মাসে সার্বক্ষণিক ট্রায়াল রান দেয়া সম্ভব নয়। কেননা, দিনের বেলা নিয়মিত যাত্রী বহন করবে মেট্রোরেল। এ নিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে ট্রেন চালানো শুরু করলেও কমার্শিয়ালি হয়তো আমরা ফেব্রুয়ারির দিকে ছেড়ে দেবো। কারণ এই টেস্ট রানে একটু সময় লাগবে। সারাদিন আমরা চালাতে পারবো না। এটা একদম কমলাপুর থেকে উত্তরা পর্যন্ত চালাতে হবে। চালাতে হলে ট্রেন অপারেশন বন্ধ রাখতে হয়, সেটা তো আমরা রাখতে পারবো না। এইজন্য ওটা রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চালিয়ে টেস্ট করতে হবে। অনর্গল চালানো গেলে এক থেকে দেড় মাসে হয়ে যেতো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন