যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক উন্নতির প্রত্যাশীদের জন্য এটি একই সঙ্গে গভীর আশা ও গভীর হতাশার সময়। একদিকে, গত সপ্তাহে দুই দেশের প্রতিনিধিদল প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি বৈঠকে বসে এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির আশায় সারারাত আলোচনা চালায়। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে কূটনীতিকের পরিবর্তে উপস্থিত ছিলেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এতে বোঝা যায়, আলোচনাকে কতোটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে, ছয় সপ্তাহব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি বোমা হামলার কারণে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এত আলোচনার পরও সর্বশেষ দফায় কোনো চুক্তি হয়নি। সব চেষ্টা সত্ত্বেও কেন তেহরান ও ওয়াশিংটন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না, তা বোঝা কঠিন নয়। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের ‘রক্তের সাগর’, যা আপসকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। এর বড় অংশের দায় ওয়াশিংটনের। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র একবার নয়, দুইবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে। এতে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি, শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর সঙ্গে উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তবে আলোচনা অচলাবস্থায় থাকলেও যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে। আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও আছে। ফলে একটি শান্তিচুক্তি এখনো সম্ভব। তবে এর জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটনকে তাদের আলোচনার পদ্ধতি নতুনভাবে ভাবতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আপসে যাওয়া। পাশাপাশি একটি সহযোগিতামূলক আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আরও বিশদভাবে বলতে গেলে, উভয় পক্ষকে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার কল্পনা ছেড়ে একে অপরের স্বার্থকে সম্মান করতে হবে। উভয়কেই মেনে নিতে হবে- অপরপক্ষ এতটাই শক্তিশালী যে, তাকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। অন্যথায় ভবিষ্যতেও নতুন সংকট ও সংঘাত তৈরি হবে।
অস্বস্তিকর বাস্তবতা: এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তির পথে যে বাধাগুলো রয়েছে, তা পরিচিত। ওয়াশিংটন চায় তেহরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করুক, নতুন করে পরমাণু উপাদান তৈরি বন্ধ করুক এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিক। কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের এসব দাবিতে রাজি নয়। ইরানের কাছে ইউরেনিয়াম শোধনের অধিকার সার্বভৌমত্ব, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং জাতীয় গৌরবের সঙ্গে জড়িত। পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য হয়েও একমাত্র দেশ হিসেবে এই অধিকার থেকে সরে দাঁড়ানোর চাপকে তেহরান অপমানজনক মনে করে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ, যা ইরানের বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের জন্য অপরিহার্য। তবে আলোচনার ব্যর্থতা শুধু এসব মতপার্থক্যের কারণে নয়। এর পেছনে শক্তি সম্পর্কে ভিন্ন ধারণাও কাজ করেছে। ইরান আলোচনায় এসেছে নিজেদের দৃঢ়তা নিয়ে। তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সম্মিলিত হামলায় টিকে গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও মনে করে তারা ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষতি করেছে এবং চাপ অব্যাহত রাখলে ছাড় আদায় করা সম্ভব। এই দুই ধারণাই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, কিন্তু অচলাবস্থা তৈরি করেছে। তবুও, দুই পক্ষের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এগোনোর পথ দেখায়। প্রথম শর্ত হলো যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা। কারণ পুনরায় সংঘাত শুরু হলে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে চলমান যুদ্ধবিরতি আস্থার পরিবেশও তৈরি করতে পারে। যেমন মানবিক সহায়তা, আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা সমুদ্রপথে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। উদাহরণস্বরূপ, খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে যৌথ সামুদ্রিক করিডোর গড়ে তোলা যেতে পারে। তেহরান বিদেশি বন্দিদের মুক্তি দিতে পারে এবং ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে।
আস্থা বাড়লে একটি স্থায়ী চুক্তির পথ সহজ হবে। কেবল দাবি-দাওয়া নিয়ে দরকষাকষি না করে স্থিতিশীলতা, বিরোধহীন সম্পর্ক এবং ধীরে ধীরে পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফেরাতে একটি অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এতে করে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনগুলোতে ছাড় দেয়া সম্ভব, তা স্পষ্ট হবে।
উভয় পক্ষকেই নিজেদের প্রাধান্য দেয়ার বিষয়গুলোতে জোর দেয়ার ধারণা ত্যাগ করতে হবে। ইরান একটি বড় ও জনবহুল দেশ, যা দীর্ঘস্থায়ী চাপ সহ্য করতে সক্ষম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি, যা কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও চাপ অব্যাহত রাখতে পারে। এই বাস্তবতা মেনে নেয়াই আপসের পথ খুলে দেবে। এরপর সংঘাতের মূল ইস্যু- অর্থাৎ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র যদি সম্পূর্ণ শোধন বন্ধের দাবি থেকে সরে আসে, তাহলে একটি কার্যকর চুক্তি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শোধনের অধিকার স্বীকার করতে পারে, আর ইরান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা প্রয়োগ না করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য ইরানের পরমাণু কার্যক্রম স্থগিত চায়, আর ইরান প্রস্তাব করেছে পাঁচ বছরের। সম্ভবত মাঝামাঝি সমাধান হতে পারে। একই সঙ্গে ইরান প্রতিশ্রুতি দিতে পারে যে, ভবিষ্যতে শোধন ৩.৬৭ শতাংশের বেশি হবে না এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কঠোর তদারকি মেনে নেবে।
খণ্ড-বিখণ্ড পথে শান্তি: পরমাণু ইস্যুর সমাধান হলে চুক্তির বড় অংশ সম্পন্ন হবে। তবে হরমুজ প্রণালিসহ অন্যান্য বিরোধও সমাধান করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে এবং অবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হামলা চালাতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাও বাড়তে পারে। এই সংকট এড়াতে উভয় পক্ষকে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ইসরাইলের বিষয়টি আরও জটিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কাজে লাগিয়ে উত্তেজনা কমানো সম্ভব। স্বল্প সময়ে পূর্ণ স্বাভাবিক সম্পর্ক সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও সংঘাত তা কঠিন করে তুলেছে। তবে পুরোপুরি বৈরিতা বজায় রাখার প্রয়োজন নেই। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাস দমন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে সহযোগিতা সম্ভব। দুই দেশ অতীতের মতো সীমিত কিন্তু কার্যকর সম্পর্কের দিকে ফিরতে পারে। এতে সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে এবং মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন কমবে। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে উভয় পক্ষকে নমনীয় হতে হবে। ইসলামাবাদে সর্বশেষ বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে কারণ দুই পক্ষই নিজেদের কঠোর অবস্থানে অটল ছিল। পরবর্তী দফার আলোচনায় তাদের প্রত্যাশা নতুনভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং আপসের প্রস্তুতি নিতে হবে। তা না হলে আবারো সংঘাত শুরু হবে। যার পরিণতি কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
(লেখক: ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং রিসার্চ কোলাবোরেটর হিসেবে যুক্ত আছেন। নিবন্ধটির মূল শিরোনাম: আমেরিকা অ্যান্ড ইরান’স লং রোড টু পিস।)
