জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের নির্দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এক কর্মকর্তা। বিটিআরসির এই কর্মকর্তার জবানবন্দি শেষ না হওয়ায় আগামী ১৯শে এপ্রিল পর্যন্ত মূলতবি রাখেন ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এক জবানবন্দিতে তিনি এ কথা উল্লেখ করেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ৪ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি এ জবানবন্দি দেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এ মামলায় পলক ছাড়াও আসামি হিসেবে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। পলাতক থাকায় তার হয়ে আইনি লড়াই করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম।
জবানবন্দিতে সাক্ষী উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় তাকে ফোন করেন তৎকালীন বিটিআরসির মহাপরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান। ফোনে জানানো হয় যে, বিটিআরসি’র তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদকে ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাব্ল (আইটিসি) অপারেটরদের আপস্ট্রিম বা ইন্টারনেট বন্ধ করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নে আইটিসি অপারেটরদের জানাতে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলতে সাক্ষীকে নির্দেশ দেন বিটিআরসি’র তৎকালীন মহাপরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিজের অফিসিয়াল মোবাইল নম্বর থেকে একটি গ্রুপ খোলেন এই কর্মকর্তা।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আইটিসি অপারেটরদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ইংরেজিতে খোলা গ্রুপটির নাম ‘১৮ জুলাই আইটিসি অপারেশনস’। এতে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন মহাপরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান, সামিট কমিউনিকেশন লিমিটিডের খালিদ, ফাইবার এটহোমের মশিউর, নভোকমের আজিজ, বিডি লিংকের একজন, ম্যাংগোর জাহিদ, বিটিসিএলের আনোয়ার মাসুদ ও বিএসপিএলসি’র ওহাব। গ্রুপটি খোলার পরই মহাপরিচালককে জানান বিটিআরসি’র এই কর্মকর্তা। এরপর তিনি (কাজী মোস্তাফিজুর রহমান) গ্রুপে কল দেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন সাক্ষী। গ্রুপ কলে ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাব্ল অপারেটরদের আপস্ট্রিম (ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ) বন্ধ করার ব্যাপারে সরকারের নির্দেশনাটি জানান বিটিআরসি’র তৎকালীন মহাপরিচালক। এরপর ওই দিনই তথা ১৮ই জুলাই রাত ৯টায় অপারেটরদের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। ২৩শে জুলাই পর্যন্ত এ সেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকে।
সাক্ষী বলেন, ২৩শে জুলাই ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) ও মিডিয়ার বিভিন্ন প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি সভা ডাকেন জুনাইদ আহমেদ পলক। সভায় ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক বন্ধ রেখে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে (যেমন ব্যাংক, সংসদ ভবন, ক্যান্টনম্যান্ট ইত্যাদি) সীমিতভাবে ইন্টারনেট চালু করার বিষয়ে নির্দেশনা দেন তিনি। পরে, ৩১শে জুলাই বিটিআরসি’র চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ইন্টারনেট পুনরায় চালু করার নির্দেশনা দেন তৎকালীন এই আইসিটি প্রতিমন্ত্রী।
ট্রাইব্যুনালকে পলকের অনুরোধ: জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে বিটিআরসি’র এই কর্মকর্তার সাক্ষ্যের একপর্যায়ে আপত্তি জানান পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ। এ সময় আসামির কাঠগড়ায় উপস্থিত পলকও দাঁড়িয়ে ট্রাইব্যুনালের কাছে কিছু বলার অনুমতি চান। পলক বলেন, এখানে বেশ গুছিয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন সাক্ষী। তিনি ইন্টারনেট সংক্রান্ত কিছু টার্মও ব্যবহার করছেন। কিন্তু তার কাছে জোর করে ও কৌশলে কিছু কিছু শব্দ জানার চেষ্টা করছেন চিফ প্রসিকিউটর। তাই সাক্ষীকে স্বাধীনভাবে জবানবন্দি দেয়ার বিনীত অনুরোধ করছি। যেন জোর-জবরদস্তি না করা হয়। জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনার ব্যাপারে কথা বলার জন্য বিজ্ঞ আইনজীবী রয়েছেন। তাদের ওপর আস্থা রাখেন।
