এখন যুদ্ধ হবে হরমুজ নিয়ে

এখন যুদ্ধ হবে হরমুজ নিয়ে

ফন্ট সাইজ:

হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরে অবরোধ কার্যকর করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এ সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার পর এই পদক্ষেপ নিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এখন মূলত যুদ্ধটা হবে এই হরমুজ নিয়েই। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের জবাবে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির সশস্ত্রবাহিনীর সদর দপ্তর বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ওমান সাগরের নিরাপত্তা হয় সবার জন্য হবে, অন্যথায় তা কারও জন্যই নয়। পাশাপাশি ইরানের বন্দরে হামলা হলে আঞ্চলিক সব বন্দরে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তেহরান।

ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ থেকে টানা ৪০ দিন ইরানের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এরপরেও তেহরানকে নোয়াতে পারেনি। ইরানের বিপ্লবী গার্ড ও তাদের নৌবাহিনী মিলে সম্মিলিত ওই হামলার কড়া জবাব দিয়েছে। যাতে শেষ পর্যন্ত নানা হুমকি- ধামকির পর যুদ্ধবিরতি দিতে বাধ্য হন ট্রাম্প। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যা অর্জন করতে পারেনি আলোচনার টেবিলে তাই চেয়েছে। যা স্পষ্টত ওয়াশিংটনের নীতিগত পরাজয়ের ইঙ্গিত বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরাইল শর্ত মানছে না। দেশটি অন্যায়ভাবে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে চলমান যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যেন আলোচনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করে। কেননা, সামরিক শক্তি প্রদর্শনে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা ইরানি বন্দর অবরোধে ট্রাম্পের পদক্ষেপে যোগ দেবে না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্প এক দীর্ঘ যুদ্ধের ফাঁদে পড়েছেন। যেখান থেকে তিনি বের হতে চাচ্ছেন, তবে তিনি পারছেন না। তাই তিনি ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ইরান জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে অনড়। কোনোভাবেই তারা সেখানে কোনো অবরোধ মানবে না। মার্কিন নৌ-জাহাজগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে দেশটি।

হরমুজ ইস্যুতে অনড় ইরান: দেশটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এই ইস্যুতে তারা কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের এক মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ এবং ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়ার মার্কিন পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের সার্বভৌম অধিকার রক্ষা করা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বৈধ দায়িত্ব। মুখপাত্র আরও জানান, ইরানের আঞ্চলিক জলসীমায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্রবাহিনী সবসময় দৃঢ় অবস্থানে থাকবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে ‘শত্রুপক্ষ সংশ্লিষ্ট’ জাহাজগুলোকে পারাপারের অনুমতি দেয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তবে অন্যান্য জাহাজ ইরানের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চললে তাদের চলাচল অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, শত্রুপক্ষের হুমকি অব্যাহত থাকায় হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করবে ইরান। একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের কোনো বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাকের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নৌ অবরোধের ঘোষণাকে ব্যঙ্গ করেছেন। সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেবে এবং মার্কিন নাগরিকদের আগের তুলনামূলক কম দামের সময়ের জন্য নস্টালজিক করে তুলবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের পরিকল্পিত অবরোধ মূলত ইরানের বন্দরগামী বা বন্দর থেকে আসা জাহাজগুলোর ওপরই প্রযোজ্য হবে। অন্য আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের স্বাধীনতা বজায় থাকবে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে, আইআরজিসি’র কুদ্‌স ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চল থেকে কোনো সাফল্য ছাড়াই ফিরে যেতে বাধ্য হবে। তিনি দাবি করেন, প্রতিরোধের শক্তিশালী ফ্রন্ট পুরো অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে এবং শত্রুদের মোকাবিলায় প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কি পুনরায় সংলাপে বসবে: শনিবার ইসলামাবাদ সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা নিরসনে পুনরায় আলোচনায় বসার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিকভাবেও এ বিষয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে। হরমুজ ইস্যু মীমাংসা না হলে জ্বালানির বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি তৈরি হবে। যার মাসুল গোটা বিশ্বকেই দিতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এ সমস্যা কূটনীতির টেবিলে সমাধান করবে কিনা। কেউ কেউ মনে করেন, এ বিষয়ে হয়তোবা দুই দেশই পর্দার আড়ালে আলোচনা চালাচ্ছেন। তাদের যুক্তি দুই দেশের প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এমন কিছু ইঙ্গিত আছে। ট্রাম্প ইসলামাবাদ সংলাপের বেশ প্রশংসা করেছেন। সংলাপটিকে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ বলেননি।

সংলাপ নিয়ে প্রথম ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে তিনি বলেন, ইসলামাবাদ আলোচনা বেশ ভালোভাবেই শেষ হয়েছে। সেখানে বেশির ভাগ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে সংলাপ শেষে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেন, প্রথম সংলাপেই সব ঠিক হয়ে যাবে ইরান এমনটি আশা করেনি। দেশটির স্পিকার বাকের গালিবাফের বক্তব্যও ছিল ইতিবাচক। তিনি বলেন, ইরানের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আস্থা অর্জন করতে পারবে। এ ছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মন্তব্যটি এক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি ‘স্বৈরাচারী আচরণ’ ছেড়ে দেন এবং ইরানি জনগণের অধিকারের প্রতি সম্মান করেন তাহলে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হওয়া সম্ভব।

ইসলামাবাদ সংলাপের পর এক্স হ্যান্ডেলে দেয়া পোস্টে এ কথা বলেন মাসুদ। তার বক্তব্য নতুন করে আলোচনার আহ্বান বলেই মনে করেন অনেকে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্লোরিডা থেকে ফিরে ওয়াশিংটন ডিসির কাছে জয়েন্ট বেস অ্যান্ডু্রজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ইরান আলোচনায় ফিরে না এলেও তার কোনো সমস্যা নেই। অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্টও চান ইরান যেন আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে। সুতরাং দুই দেশই পুনরায় আলোচনায় বসার পথ খুঁজছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রণনীতি ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে ইরান পুনরায় আলোচনায় প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেই এজেই। বলেছেন, ইরান আলোচনায় বসতে এবং সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত, তবে তা অবশ্যই নীতি ও যুক্তির ভিত্তিতে হতে হবে। সোমবার বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পরিষদের বৈঠকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ৪০ দিনের সংঘাতের পর ‘মাঠ ও কূটনীতি’- উভয় ক্ষেত্রেই শত্রুর লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বভাবসুলভ ঔদ্ধত্য নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে এমন কিছু দাবি তুলেছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তিনি আরও বলেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহী, তবে তা অবশ্যই পারস্পরিক সম্মান, নীতি এবং যৌক্তিকতার ভিত্তিতে হতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সামপ্রতিক সংঘাতে অর্জিত সাফল্য রক্ষা করা এখন সবার প্রধান দায়িত্ব।

সংযম দেখানোর অনুরোধ চীনের: হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে চীন সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং বাধাহীন রাখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবার স্বার্থে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীন সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়লেও বেইজিং কূটনৈতিক সমাধান ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছে।

আইয়ান আহমেদ

৩ মাস আগে

এরা যুদ্ধ করে হরমুজ নিয়ে। আমরা বাংলাদেশিরা গতবছর যুদ্ধ করেছিলাম তরমুজ নিয়ে। একেকটা তরমুজ ৭০০-৮৫০ টাকাও বিক্রি হয়েছিল। কোন কোনটি হাজার টাকাও। একটা রফাদফায় তরমুজের যুদ্ধ এবছর নেই, আশা করি হরমুজের যুদ্ধও থেমে যাবে।

Shahid

৩ মাস আগে

Iran is a defender party in the current Middle East crisis. The President of Iran asked the rest of the world what the motif of this war suddenly attacked Iran and dropped a bomb to vanish a leader where Iran was unprepared to save them. It is possible to sit together to resolve economic and some political issues but how to return a soul through a compromise solution. The defender is always a weak party and the invader is a party on the wrong side. The judgment is never in favor of a wrongdoer and also judgment will remain undone.

মন্তব্য করুন