বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য করের আওতা বাড়ানো অপরিহার্য। তবে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের ব্যবসায়ীদের ওপর কোনো খড়্গ নামবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল২৪ যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব শৃঙ্খলা আনতে আমাদের করের আওতা বাড়ানো দরকার। তবে ব্যক্তির ওপর করের চাপ বাড়ানো নয় বরং করের আওতা (ট্যাক্স বেস) বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য। আশা প্রকাশ করে তিনি জানান, আসন্ন বাজেট ও পরবর্তী সময়ে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে। এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতার ওপর তার আস্থা রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে বাজেটের আকার বড় করেছে। এর ফলে বর্তমানে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। এ সময় আসন্ন বাজেটে ট্যাক্স বাড়ানোর উদ্যোগ থাকলেও ব্যবসায়ীদের ওপর খড়্গ থাকবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমার সিনিয়র সহকর্মী অর্থমন্ত্রীর ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তিনি ব্যবসাবান্ধব ব্যক্তি। তিনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বোঝেন। এই মৌলিক বিষয়টি না বোঝার কোনো কারণ নেই। আমি বেসরকারি খাতকে বলবোÑ আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। আমরা একসঙ্গে কাজ করবো এবং দেশকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবো।’ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে প্রথমেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হবে। অতীতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতির কারণে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব এখনো বিদ্যমান। সরকার ও অর্থনীতির অন্যান্য অংশীজনদের মধ্যে সংযোগ ও স্বচ্ছতা না থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করা সম্ভব নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সহজ ব্যবসা প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা জরুরি। সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা ঘরে বসেই লাইসেন্স ও নিবন্ধন সেবা গ্রহণ করতে পারেন। জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, জিটুজি চুক্তির আওতায় যে এলএনজি আমার স্পট মার্কেট থেকে ১০ ডলারে কিনতাম, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ২০ ডলারে। যে ক্রুড অয়েল ৫০-৬০ ডলারে কিনতাম, সেটি এখন কিনতে হচ্ছে ১১৬ ডলারে। যে সার আমরা ৪৫৬ ডলারে কিনতাম, সেটা ৮০০ ডলারে কিনতে হচ্ছে।
তবুও শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একইসঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে কোনোকিছুর স্টোরেজ অ্যারেঞ্জমেন্ট নেই। আজকে যদি আমাদের কাছে ২ মাস রাখার মতো এলএনজি’র মজুত থাকতো তাহলে ১০ ডলারের এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে ২০ ডলারে কিনতে হতো না। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে আমদানিনির্ভর প্রতিটি পণ্যের স্ট্রেটেজিক রিজার্ভ আছে, শুধুমাত্র বাংলাদেশে নেই। আগামীদিনে আমরা এসব বিষয়ে কাজ করার পাশাপাশি প্রক্রিয়াগুলো আরও সহজ করতে কাজ করবো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আক্তার হোসেন বলেন, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ যত কম হবে তত ভালো। বর্তমান বাস্তবতায় সরকারকে পপুলিস্ট বাজেট না দিয়ে সংকোচনমূলক বাজেট করতে হবে। সতর্কতার সঙ্গে বাজেট দিতে হবে। এমন বাজেট প্রণয়ন করা ঠিক হবে না যাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, সাধারণ মানুষ কষ্টে পড়ে।
ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহীর বলেন, ব্যাংক খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ একটা বড় সমস্যা। পাশের দেশ ভারতে আড়াই শতাংশ, পাকিস্তানের খেলাপির হার ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ৩০ শতাংশের ওপরে। মন্দ ঋণ কমানোর একটা ফ্রেমওয়ার্ক করতে হবে।
সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, ব্যবসা শুরু করা যেমন সহজ করা উচিত, একইসঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা, কোনো কারণে বন্ধ হলে পুনরায় চালু করাও সহজ করতে হবে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই কর ব্যবস্থার অটোমেশন নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তিনি অভিযোগ করে বলেনÑ কর প্রশাসনের অপ্রয়োজনীয় চাপ ও দুর্নীতি ব্যবসার অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। সরকার ও বেসসরকারি খাতের মধ্যে আরও বেশি সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
বাজেটে ব্যবসায়ীদের ওপর খড়্গ নামবে না: বাণিজ্যমন্ত্রী
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
