গত এক বছরের সংস্কার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। বড় ধরনের সংস্কার ও পরিবর্তনের পথে হাঁটছে প্রতিষ্ঠানটি। সোমবার দুপুরে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে পিএসসি’র আয়োজনে গ্রিডলক থেকে শাসনব্যবস্থার নবায়ন: বিপিএসসি সংস্কার প্রতিবেদনে পরিকল্পনাগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন সংস্কার কমিশন। তাদের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তৈরি করা হয় এ প্রতিবেদন। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা ফেরানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, কমিশন চারটি আংশিক ও ওভারল্যাপিং বিসিএস পরীক্ষা, নন-ক্যাডার নিয়োগে বড় ধরনের জট এবং পরীক্ষার স্বচ্ছতা সংক্রান্ত কাঠামোগত দুর্বলতা শনাক্ত করে। প্রথম ১৩ মাসেই কমিশন নিয়োগ জট সম্পূর্ণরূপে নিরসন করে। প্রায় ৩ মাসে দু’টি বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা সম্পন্ন করে (যা আগের তুলনায় প্রায় ৭৫% দ্রুত)। নিয়োগের মানদণ্ডে বড় পরিবর্তন এনে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। পরীক্ষার ব্যয় সর্বোচ্চ ৮০% পর্যন্ত কমানো হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের আর্থিক বোঝা কমাতে বিসিএস পরীক্ষার আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা নির্ধারণ করেছে কমিশন। নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ বা এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস সম্পন্ন করার বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা রুখতে পিএসসি নিজস্ব প্রেস স্থাপন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। আগে যেখানে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ৬ মাস সময় লাগতো। এখন তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া, ২০২৫-২০২৯ সময়কালের জন্য প্রথমবারের মতো একটি পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।
তরুণ প্রজন্মকে বিসিএস ‘অসুখ’ থেকে বের হওয়ার আহ্বান
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মকে বিসিএস ‘অসুখ’ থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, অনেক তরুণকে দেখা যায়, ভালো চাকরি রেখে চাকরির বয়স যতদিন আছে ততদিন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিচ্ছেন। অনেকে বিসিএস পরীক্ষা দিতে দিতে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের টেবিলে দেখা যায় বিসিএসের বই। তরুণদের জীবনের বড় একটা সময় খেয়ে ফেলছে বিসিএস। এই ‘অসুখ’ থেকে বের হতে হবে। জাহেদ উর রহমান বলেন, বিসিএসে ইনসেনটিভ কমাতে হবে। বয়সসীমাও কমানোর পাশাপাশি পরীক্ষা আরও হার্ড করতে হবে। অনেক তরুণ বুঝে না, পরীক্ষা হার্ড করলে তাদের লাভ। কারণ, একবার পরীক্ষা দিয়ে যখন দেখবে সে বিসিএসের যোগ্য নয়, তখন অন্য পথে যাবে। এটা করতে গিয়ে অনেকের বিরাগভাজন হতে হবে। বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা পরীক্ষকের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন বিসিএসের ভাইভা বোর্ডে ছিলাম। তখন অনেক পরীক্ষার্থীকে তার মেজর বিষয় থেকে প্রশ্ন করেছি, কিন্তু ভালো উত্তর পাইনি।
‘সরকারি চাকরিতে শূন্যপদ পূরণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা’
এ সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে বিদ্যমান শূন্যপদ দ্রুত পূরণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে ১৮০ দিনের একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ধাপে-ধাপে তাদের শূন্যপদের তথ্য হালনাগাদ করা, নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ, নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী প্রস্তাব তৈরি এবং দ্রুত তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং কার্যকর করতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় জোরদার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাতে দীর্ঘদিন শূন্যপদ না থাকে, সেজন্য একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকেও সরকার কাজ করছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ধাপে ধাপে শূন্যপদ পূরণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে সরকারি সেবার গতি ও মান আরও বৃদ্ধি পাবে। সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ নেই। বিদ্যমান নিয়োগ পদ্ধতিগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পিএসসি দেশের সবচেয়ে বড় নিয়োগকারী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। যা প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। সম্প্রতি পিএসসি একটি নির্ধারিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকার এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে। অতীতে প্রশ্নফাঁস, খাতা মূল্যায়ন এবং মৌখিক পরীক্ষাকে ঘিরে জনমনে কিছু প্রশ্ন ছিল। তবে বর্তমানে এসব বিষয়ে উন্নতি হয়েছে এবং আরও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ও পদ্ধতি নিয়ে মানুষের মধ্যে যে সংশয় রয়েছে, তা দূর করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, একজন কর্মকর্তা যদি নিজে স্বাধীনভাবে কাজ করার মানসিকতা না রাখেন, তাহলে তাকে কেউ স্বাধীনভাবে কাজ করাতে পারবে না। পিএসসি একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। আইনগত সুরক্ষার কারণে এর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেনÑ প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, পিএসসি’র সদস্য ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ের সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া। এ সময় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সহযোগীরা উপস্থিত ছিলেন।
