কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর হামলায় নিহত ‘পীর’ শামীম রেজা বা শামীম জাহাঙ্গীর (৫৫) এর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রোববার বিকাল সাড়ে ৫টায় পুলিশ প্রহরায় দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থানে জানাজা শেষ তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। এর আগে বিকাল সাড়ে ৩টায় নিহত শামীম রেজার মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিজ বাড়িতে নেয়া হয়। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ কবরস্থানে নেয়া হয়। তবে ওই ‘পীর’ শামীম রেজার জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে তার ভক্ত ও অনুসারীদের উপস্থিতি ততটা লক্ষ্য করা যায়নি। দুই একজন ভক্তকে দেখা গেলেও তারা এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। এদিকে নিহত শামীম রেজার দাফন দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামের তার নিজ আস্তানায় করার জন্য দু’এক ভক্ত দাবি জানালেও নিহতের পরিবার, এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সেটা সম্ভব হয়নি। এদিকে শামীম রেজাকে হত্যার পর থেকে তার আস্তানা ও আশপাশের এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আস্তানা বা দরবার শরীফে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া আস্তানার আসবাবপত্র ও বাদ্যযন্ত্র ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। রোববার দুপুর ১২টার দিকে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন) শেখ জয়নুদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকার কথা বলেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি এবং এ ঘটনায় কেউ আটক বা গ্রেপ্তার হয়নি বলে দৌলতপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে।
শনিবার ঘটনার পর রাতেই কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, পুরনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে (শামীম) উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। শামীম হত্যার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। বিজিবি’র টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। হামলার ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তাদের বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়াও দৌলতপুরের হোসেনাবাদ এলাকার বাউল শিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার খবর পেয়ে কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি আলহাজ রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা ঢাকা থেকে এলাকায় ছুটে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। অপরাধী যেই হোক তার জন্য আইন আছে, প্রশাসন আছে। তাই বলে আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা করা এটা কারও জন্য কাম্য হতে পারে না। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে বলে উল্লেখ করেন।
এর আগে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে পীর শামীম রেজাকে তার আস্তানার দোতলার নিজ কক্ষ থেকে টেনেহেঁচড়ে বের করে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে দোতলা থেকে নিচে ছুড়ে ফেলা হয়। সেখান থেকে তার ভক্তরা উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তার আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলায় ওই ‘পীরে’র কয়েকজন নারীভক্তসহ অন্তত ৭ জন আহত হয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক ভিটায় আস্তানা গড়ে তোলেন এবং নিজেকে ‘সংস্কারপন্থি ইমাম’ পরিচয় দিতেন। তার আগে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় যুক্ত হন। ২০২১ সালে একটি শিশুর মরদেহ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি সে সময় আলোচনায় আসেন। একই বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়।
পীরের লাশ পুলিশ প্রহরায় দাফন
আস্তানায় নেই ভক্তদের আনাগোনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
১৩ এপ্রিল (সোমবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

শহিদুল ইসলাম
২ মাস আগেবিপদজনক ঘটনা ঘটছে দেশে। দেশের মানুষ আশা করেছিল গনতান্ত্রিক সরকার মব কালচার কঠোর হস্তে দমন করবেন। কিন্তু মব কালচার বেড়ে চলছে। আইন কেউ হাতে নিতে পারে না। মব কালচার কঠোর হস্তে দমন না করলে সরকারও মব কালচারে আক্রান্ত হবে। মব কালচার কঠোর হস্তে দমন করুন।