বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ হরমুজ প্রণালি অচলে সংকটে বাংলাদেশ

বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ হরমুজ প্রণালি অচলে সংকটে বাংলাদেশ

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি। ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহন হয় এই সামুদ্রিক রুটে। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এই হরমুজ প্রণালির একেবারেই কাছাকাছি আটকে রয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা।’ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চললেও অনুমতি দেয়া হচ্ছে না বাংলাদেশী পতাকাবাহী এই জাহাজকে। বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকটে জ্বালানি তেলের হাহাকার ও নাভিশ্বাস বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের মতো আরও অনেক দেশের জাহাজ দিনের পর দিন আটকে থাকায় কোমর ভাঙছে অর্থনীতির। দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৪ টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের এই ‘লাইফ লাইন’ অবরুদ্ধ-অচল থাকায় এটি এখন ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরায়েল আগ্রাসনে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্র হিসেবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে অপরিশোধিত-পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বড় উৎস বা বাজার মধ্যপ্রাচ্য। দেশের জ্বালানি চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ আমদানি-নির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ থেকে আসে প্রতি বছর দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল। এলএনজির ৫৫ শতাংশের যোগান দেয় কাতার ও ওমান। আবার এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার প্রায় পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। হরমুজ প্রণালি সচল না হলে দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনাসহ আর্থিক খাতে বড় সংকট দেখা দেবে।
বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই ‘চেকপয়েন্ট’ বন্ধ থাকায় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও। লাগামহীন হতে পারে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি। যা গভীরভাবে প্রভাবিত করবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে। বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প ও গণপরিবহন খাতেও পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সানেম এরই মধ্যে সতর্ক করে জানিয়েছে, এই সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
একটি সরু জলপথ হরমুজ প্রণালী আজ বিশ্ব পরাশক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাতের প্রধান মঞ্চ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তেলের দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়বে। হয়েছেও তাই। লোডশেডিং করে জনগণের ভোগান্তির পথে না হেঁটে সরকার প্রতি মাসে জ্বালানি তেলে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দেয়ায় বিপর্যস্ত শিল্পখাতও। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো।
সময়মতো তৈরি পোশাক রপ্তানি করা সম্ভব না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান হারাবে। অন্যদিকে, ডিজেলের দাম বাড়লে বাস, ট্রাক, লঞ্চ-সব ধরনের পরিবহনের খরচও বাড়বে। পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় ইতোমধ্যেই লাফিয়ে বেড়েছে ভোজ্যতেল, চিনি, এলপিজি, মুরগি, সবজিসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম। ফলে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার প্রাণকেন্দ্রের অচলাবস্থায় বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায়ে সংবেদনশীল এই প্রণালিকে চলমান যুদ্ধে ইরান বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজেরা হরমুজ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কৌশলগত এক প্রভাব অর্জন করেছে।
জ্বালানি খাতের চলমান এই বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রভাব মোকাবিলায় সরকার একই সঙ্গে সাশ্রয়, রেশনিং ও বিকল্প উৎসে জোর দিচ্ছে। যানবাহনভিত্তিক নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে ‘প্যানিক বায়িং’ নিয়ন্ত্রণ এবং সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দক্ষ হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে বেশ আত্মবিশ্বাসীই মনে হচ্ছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকার জ্বালানির তেলের দাম বাড়ায়নি। একই সঙ্গে সরকার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ট্যাগ অফিসার। পেট্রোল ও অকটেন বিক্রির ক্ষেত্রে ‘ফুয়েল পাস’ চালু হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সবগুলো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও অর্গানকে এক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। অবৈধ মজুত সংকট বাড়িয়ে দেয়ায় তাদের আইনের আওতায় এনে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। যেন ভবিষ্যতের জন্য এটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। বিশ্লেষকরা এও মনে করেন, কঠিন বাস্তবতায় সরকারকে জ্বালানি তেল দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকারখানা ও সেবা খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যুদ্ধকালীন সীমিত জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সামনের দিনগুলোতে জ্বালানির চাহিদা ও জোগান ডিজিটাল করার উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজনীয়তা সরকারের কাছে এখন বেশ জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থেকে সরে আসতে চায় সরকার। জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প ও বহুমুখী উৎসের দিকে ঝুঁকছে। তাঁরা কৌশলগতভাবে কাজাখস্তান ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের চুক্তির লক্ষ্যে এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (ইএমআরডি) ১৯ মার্চ নাইজেরিয়া এবং ২৪ মার্চ কাজাখস্তান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকার রাশিয়ার কাছ থেকে কোনো ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা ছাড়াই পরিশোধিত জ্বালানি কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিষেধাজ্ঞায় ছাড় বা অব্যাহতির অনুরোধ জানিয়েছে। গত ২২ মার্চ ওয়াশিংটনকে এই সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখানে রাশিয়া থেকে ছয় লাখ টন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির অনুমতি অথবা বিকল্প হিসেবে অন্তত দুই মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতির অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালির কাছে আটকে আছে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানি করে তাদের জাহাজ হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকলে সামনের দিনগুলোতে সংকট আরও বাড়বে।
লেখক : গণমাধ্যকর্মী, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন