বিশেষ ধরনের সেই অপরাধীদের তালিকাটি এখন আর নেই সরাইল থানায়। বাংলাদেশে একমাত্র সরাইল থানাতেই ছিল ‘কারিফক্কর’ নামীয় অপরাধীদের ওই তালিকা। স্থানীয়রা জানান, ১০-১২ বছর আগেও অন্যান্য অপরাধীদের তালিকার সঙ্গে থানার দেয়ালে ঝুলতে দেখা গেছে এই তালিকা।
মোগল আমলের প্রাচীন এই জনপদ যেমন ইতিহাসে নানাভাবে ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়েছে তেমনি ‘কারিফক্কর’ কলঙ্কের তিলক হয়ে আছে। এখন ‘কারিফক্কর’ না থাকলেও প্রতারণার সংজ্ঞায় ‘সরাইল্লা কারিফক্কর’ কথাটি লেপ্টে আছে। প্রতারণার কারিশমায় তারা জায়গা করে নিয়েছে অপরাধ বিজ্ঞান বইয়ে। সারদা পুলিশ একাডেমিতে যা পাঠ্য হয়েছে পুলিশের। ফলে অপরাধ ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা কারিফক্করদের তালিকা ঐতিহাসিক রেকর্ড হিসেবেই বিবেচিত। এটি থানা থেকে কীভাবে উধাও হয়ে গেল তা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, সরাইল উপজেলার সৈয়দটুলা, নতুন হাবেলী, গুনারা, টিঘর, চানমনিপাড়া, আলীনগর, মোগলটোলা, জালুয়াপাড়া, নিজ সরাইল, নোয়াহাটি-এসব গ্রামের ১৯-২০ জন কারিফক্করের নামের একটি তালিকা ছিল সরাইল থানায়। ২০০৮ সালেও এই তালিকা সংরক্ষণ করে থানার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এরপর আরও কয়েক বছর থানার দেয়ালে এই তালিকা ঝুলতে দেখেছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি থানায় গিয়ে খোঁজ করে এই তালিকা পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য অপরাধীদের তালিকা থানার দেয়ালে ঝুলতে দেখা গেছে।
১৮৩০ সালে সরাইল থানা প্রতিষ্ঠার তথ্য পাওয়া গেলেও কোন আমলে কারিফক্করদের দৌরাত্ম্য বা তৎপরতা শুরু হয়, কখন তাদের তালিকা প্রণয়ন করে থানায় ঝুলানো হয়, সে ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওই থানায় দীর্ঘ সময় কর্মরত ছিলেন এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আমাদের সময় তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু তারা অপরাধ জগতের মধ্যে তালিকাভুক্ত ছিল। কারিফক্করের তালিকা ছিল থানায়। হিস্ট্রিশিট ছিল। তাদের মধ্যে যারা জীবিত ছিল তাদের পর্যবেক্ষণ করতে হতো। তবে স্বাধীনতার পর তাদের কার্যক্রম ছিল কিনা সন্দেহ। অবশ্য থানার সেই পুরনো বিল্ডিং নেই। নতুন ভবন হয়েছে। থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনজুর কাদের ভূঁইয়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এখানে যোগদান করেন। তখনই তালিকা দেখতে পাননি বলে জানান। তবে অপরাধ বিজ্ঞান বইয়ে এ বিষয়ে একটা চ্যাপ্টার আছে বলে জানান মনজুর কাদের। তিনি আরও বলেন, অনেক রেজিস্ট্রার এখন এবুলিশ হয়ে গেছে। ভিলেজ ক্রাইম নোট বুক নেই। সার্কেল অফিসে থাকা পিজিয়ন বুকসও নেই। যেখানে ক্রাইম কার্ড রেখে দেয়া হতো। এখন ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আছে। ওখানে নাম সার্চ করলে যতো রকম অপরাধ আছে চলে আসবে। কারিফক্করদের নানা গল্প সরাইলের প্রবীণদের মুখেমুখে। নিজে এলাকার বাইরে দূর-দূরান্তে তারা বিছিয়েছে প্রতারণার জাল। কলকাতা, এমনকি মিয়ানমারেও চলে গেছে তাদের ভাষায় ক্ষেপ মারতে। ব্যাপক আলোচিত ‘কারিফক্কর’ শব্দের কোনো অর্থ পাওয়া যায়নি। অভিধানে ‘ফক্কর’ অর্থে বলা হয়েছে ফাঁকিবাজ, চালাক, ধাপ্পাবাজ। আর ‘কারি’ অর্থে কোনো কর্ম সম্পাদনকারীকে বুঝানো হয়েছে। এই নাম বা উপাধি কীভাবে এলো তাও জানা সম্ভব হয়নি। হামজা হোসেনের লেখা ক্রিমোনোলজি (অপরাধ বিজ্ঞান) বইয়ে ‘কারিফক্কর’ বলতে বিশেষ ধরনের প্রতারককে বুঝানো হয়েছে। তাদের প্রতারণার কৌশল, কাদের টার্গেট করা হতো সেসবও তুলে ধরা হয়েছে তার লেখায়। সরাইলের প্রবীণ এক ব্যক্তির মতে এটি সাংকেতিক ভাষা। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা সরাইলের সাধারণ মানুষ কারিফক্কর বলতে ‘বাটপার’, ‘বাটপারি’, ‘চিটারি’ ইত্যাদিকেই বুঝেন।
কী করতো কারিফক্কর। দূরে কোথাও গিয়ে তাদের কেউ দরবেশ-আউলিয়া সাজতো। গ্রুপের লোকই তাকে টাকা পয়সা দিতো। বাবা আমার টাকাটারে ফু দিয়া দেন। এরকম দেখে আশপাশের ব্যবসায়ী যদি থাকতো এরাও দিতো। পীর সাহেব সাজতো। হাত-পা টিপতো এদের সঙ্গের লোক। ওইখানের লোক তো আর বুঝতো না। নিজেরা বান্ডেলের বান্ডেল টাকা বাবার সামনে রাখতো। বাবা কারও টাকা রাখছে, কারও টাকা রাখে নাই। এভাবেই মানুষকে কনভার্ট করতো। দেখা গেছে, তৎকালীন সময়ে ৫০/৬০ হাজার টাকা নিয়া আইসা পড়ছে। যা এখনকার ৫০/৬০ লাখ টাকা হবে। মাঝে মাঝে আবার টাকা বদল করতো। ওপরে নিচে দিতো আসল টাকা। মাঝখানে নকল টাকা রাখতো। টাকা বাড়াইয়া দেবে, ৫’শ টাকা দিলে হাজার টাকা পাইয়া লাইবেন। ৭২ বছর বয়স্ক সরাইল সদরের প্রবীণ এক ব্যক্তি কারিফক্করদের এই গল্পগুলো শুনান। বলেন, আমার জন্ম ১৯৫৩ সালে। এরআগের কথা তো বলতে পারবো না। যখন এইট-নাইনে পড়ি, তখন থেকেই তাদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা হইছে। তিনি আরও জানান, তাদের প্রজন্ম যারা আছে এরা এখনো ওই প্রকৃতিরই রয়ে গেছে। এরা বিদেশ থেকে টাকাপয়সা কামাইয়া ভালা ভালা মানুষের বাড়িতে বিয়ে করছে। এস্টাবলিস্ট ফ্যামিলি।
সরাইল থানায় চাকরি করেছেন অবসরপ্রাপ্ত এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সোজা কথা হচ্ছে আমরা বর্তমানে প্রতারক বলতে যা বুঝি সেটাই ছিল কারিফক্কর। তাদের বেশভুষা ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। এক রকম টুপি পরতো। সাদা পাঞ্জাবি পরতো, ধুতি পরতো। ধুতিটা লুঙ্গির মতো পরতো। আসকান পরতো। দেখলেই যেন আদাব-নমস্কার দেয়। তাদের সমীহ করে। আমি দেখছি রাসু, হুরুন আলী, কুতুব আলীকে। অন্যদের দেখলেও মনে নেই। হুরন আলী বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারে যেতো, জমিদারের মতো হাঁটতো। বেশভুষা দেইখখা প্রায়দিনই ভুলে সালাম দিতাম। রাসুরে দেখলেও সালাম দেয়ার উপক্রম হতো। আমি যে সময় দেখছি তাদের আর্থিক অবস্থা তুঙ্গে। পরে তারা অভাবগ্রস্তও ছিল।
হামজা হোসেনের লেখা ক্রিমোনোলজি (অপরাধ বিজ্ঞান) বইয়ে ‘কারিফক্কর’ সম্পর্কে লেখা রয়েছে। যা সারদা পুলিশ একাডেমিতে পড়ানো হয়। বইয়ের লেখায় বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া গ্রামটিতে বসবাসকারী ‘কারিফক্কর’দের বিশেষ প্রতারণার জন্য স্বাধীনতার পূর্বে থেকেই পুলিশের নজরে এসেছিল। এই চক্রটি মূলত ‘স্বর্ণ ডাবল’ বা স্বর্ণ পরিষ্কার করে দেয়ার নাম করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। তারা সাধারণত ফকির, দরবেশ বা জাদুকরের বেশ ধরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো। তাদের কথা বলার ধরন ছিল অত্যন্ত বিনয়ী এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ, যাতে সহজেই মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা যায়।
নামকারা কারিফক্করদের কেউ এখন আর জীবিত নেই। তবে সরাইলের মানুষের মুখেমুখে রয়েছে হুরুন আলী, রাসু, রাজা, প্রজা, খাজা, কুতুব আলী, ইদু মেম্বার, ইদ্রিস খাঁ, আবদুল আলী, হানিফ পাঠান, তারা মিয়া, মলাইয়ের নাম। পরে তাদের ছেলে-নাতিরাও জড়িয়েছে প্রতারণার পেশায়। তাদের সহযোগীদের ২/১ জন জীবিত আছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তাদের প্রজন্ম সরাইলে আছে। সময়ের সঙ্গে তাদের সামাজিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। উত্তরাধিকারদের কর্মকাণ্ড চাপা দিয়ে রাখতে চান তারা। থানার অপরাধ চার্ট থেকে নাম কাটানোর চেষ্টাও করেছেন তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময়।
