ঘুম নেই সরস্বতী পালের (২০) চোখে। রাতদিন সমানতালে রং করে চলেছেন মাটির খেলনাগুলোতে। আসছে বৈশাখকে ঘিরে তার এই আয়োজন। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি গড়ছেন মাটির গাছ, পাখি, ফুল, ফুলের টব, ব্যাংক, ফলমূল আর কতো কি? এসব রং করার দায়িত্ব পেয়েছেন সরস্বতী। স্প্রে মেশিনে মনের মাধুরী মিশিয়ে রং ছড়াচ্ছেন মাটির খেলনাগুলোতে। নীলফামারীর সৈয়দপুর শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে চওড়া পালপাড়া গ্রাম। অবস্থান সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নে। এ গ্রামের ৩০০ পরিবার কুমারের কাজ করেন। মাটি এ কাজের প্রধান উপকরণ। পাশের চিকলী, যমুনেশ্বরী প্রভৃতি নদীর পলিমাটি সংগ্রহ করে গড়েন ওই পরিবারগুলো মাটির তৈজসপত্র, হাঁড়ি, কলসি, পিঠা তৈরির সরঞ্জামসহ কতো কিছু। এর পাশাপাশি কেউ কেউ গড়েন খেলনা। কুমাররা জানান, খেলনাসামগ্রীর অনেক চাহিদা। ঈদ, দুর্গাপূজা, মহররম গ্রামীণ মেলায় এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা। পুঁজির অভাবে আমরা চাহিদা অনুযায়ী খেলনা তৈরি করতে পারি না।
সরজমিন গেলে কথা হয় সরস্বতী পালের সঙ্গে। তিনি জানান, হাতে সময় নেই। সামনে পহেলা বৈশাখ, তাই ফুরসত কম। সরস্বতী পাশের হাজারীহাট কলেজের ছাত্রী। বললেন, স্বামীকে সহযোগিতা করছি। তাছাড়া সবাই বলে, আমার হাতে রং করা নাকি খুব সুন্দর হয়। সরস্বতীর স্বামী দীপক পাল জানান, বৈশাখী মেলা উপলক্ষে চট্টগ্রাম থেকে অর্ডার পেয়েছি। পাঁচ লাখ টাকার খেলনা নেবে তারা। এজন্য কুমার পাড়ার মানুষের ঘুম নেই। আমরা দু’মাস ধরে কাজ করছি। মাটি দিয়ে খেলনা তৈরি, পোড়ানো, রং করা এসব অনেক কষ্টের কাজ। দু’-একদিনের মধ্যেই ট্রাক আসবে। ওই ট্রাকে চেপে চলে যাবে খেলনাগুলো চট্টগ্রামে। পালপাড়ার গোপলা চন্দ্র রায়ও খেলনা তৈরি করছিলেন। সুন্দর সুন্দর মুখাবয়ব, জাতীয় নেতাদের প্রতিকৃতি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের মূর্তি। আরও কতো কী।
অজয় পাল বললেন, পুঁজি সংকটে আমাদের অনেকেই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। কিন্তু যদি এখানে ব্যাংকগুলো জামানতহীন ঋণ দেয়, তাহলে আমাদের তৈরি এসব খেলনা কেবল দেশে নয়, বিদেশেও বাজার পাবে। তিনি জানান, পালপাড়ার কুমাররা ভালো কাজ করতে চায়। এবার বৈশাখে আমরা পাঁচ লাখ টাকার খেলনা বিক্রি করবো। প্রতিটি খেলনার পাইকারি দাম নিচে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকা পর্যন্ত। এজন্য অবশ্য পুঁজির জোগান দিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংকসহ কিছু কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। দি সৈয়দপুর বণিক সমিতির সভাপতি ইদ্রিস আলী জানান, পালপাড়ার কুমাররা ভালো ভালো কাজ করছেন। তাদের জন্য অবশ্যই পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। আমরা এ নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলবো।
