রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও সম্মান দিন: দালালমুক্ত শ্রমবাজারের বিকল্প নেই

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও সম্মান দিন: দালালমুক্ত শ্রমবাজারের বিকল্প নেই

ফন্ট সাইজ:

প্রবাসী ভাই-বোনদের পাঠানো রেমিট্যান্সই আমাদের অর্থনীতির প্রাণ প্রবাহ। গ্রামবাংলার কাঁচা মাটির ঘর থেকে শহরের ঝকঝকে বহুতল ভবন—অগণিত স্বপ্নের ভিত গড়ে উঠেছে প্রবাসীদের ঘামঝরা অর্থের ওপর। কিন্তু একটি নির্মম সত্য আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই—যাদের ত্যাগে এই অর্থনীতির ভিত শক্ত হয়, তাদের জীবনই কেন এত অনিশ্চিত, এত বঞ্চিত?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় বৈদেশিক শ্রমবাজারের বাস্তবতার দিকে। সেখানে আমরা দেখি, একটি সম্ভাবনাময় খাত কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে দালালচক্র এবং শোষণের জালে আটকে আছে।—যেখানে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধার স্বপ্নের চেয়ে দালালদের দাপট বড়, আর নীতির চেয়ে অনিয়মের শক্তি বেশি।

বাস্তবতা হলো, মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বৈধভাবে যেতে সরকার নির্ধারিত খরচ মোটামুটি নির্দিষ্ট ও সহনীয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—
মালয়েশিয়ায় একজন শ্রমিক পাঠাতে সরকারি নির্ধারিত খরচ সাধারণত ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা।
অন্যদিকে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত বা ওমানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই খরচ অনেক ক্ষেত্রে ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকার মধ্যেই সম্পন্ন হওয়ার কথা।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি বেদনাদায়ক। একজন সাধারণ শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় যেতে দিতে হয় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও একই চিত্র—যেখানে সরকারি খরচ ১-২ লাখ, সেখানে বাস্তবে গুনতে হয় ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা। কখনো কখনো তা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা চলে যায় দালালচক্রের পকেটে—যারা কোনো আইনি কাঠামোর মধ্যে নেই, কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই অবৈধ চক্রই মানুষের স্বপ্নকে পণ্য বানিয়ে নির্দয়ভাবে মুনাফা অর্জন করছে যুগ যুগ ধরে। আর বিদেশ আসা-যাওয়ার পথে নিজ দেশের বিমানবন্দরে হয়রানির চিত্র তো বহু পুরনো।

একজন প্রবাসী শ্রমিকের জীবনগাথা কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের গল্প নয়; এটি এক গভীর মানবিক উপাখ্যান। কেউ নিজের শেষ জমিটুকু বিক্রি করেন, কেউ মায়ের গহনা বন্ধক রাখেন, কেউবা সুদের বোঝা কাঁধে নিয়ে অজানা ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ান। তাদের চোখে একটাই স্বপ্ন—পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় সেই স্বপ্নকে নির্মমভাবে ভেঙে দেয়। বিদেশে গিয়ে তারা পড়েন প্রতারণার ফাঁদে, অমানবিক কর্মপরিবেশে কিংবা চুক্তিভঙ্গের শিকার হয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। আর নারীকর্মীদের ওপর বিকৃত যৌন হয়রানির অভিযোগ তো আছেই।

এই অমানবিক বাস্তবতার পরিবর্তন এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া উচ্চপর্যায়ের বৈঠক একটি নতুন আশার বার্তা দিয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এর আলোচনায় শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সূচনা। তবে এই অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।

কারণ শ্রমবাজার কেবল অর্থনীতির একটি খাত নয়—এটি রাষ্ট্রের মর্যাদা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। একজন প্রবাসী শ্রমিক যখন বিদেশে কাজ করেন, তখন তিনি কেবল নিজের পরিবারের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার সাফল্য দেশের সম্মান বাড়ায়, আর তার দুর্দশা দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কারণ বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি এখনো দালালচক্র। তারা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ প্রায় বাধ্য হয় তাদের মাধ্যমে বিদেশে যেতে।

এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রথমেই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। প্রত্যেকটি ধাপ—নিবন্ধন, ভিসা, মেডিকেল, টিকিট—সবকিছু অনলাইনে ট্র্যাকযোগ্য করতে হবে। সরকার নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়কে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বাস্তবায়ন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে প্রবাসীদের আসা-যাওয়ার পথে বিমানবন্দরে হয়রানি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।

এই বাস্তবতায় প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না—তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে প্রবাসীদের জন্য একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ কল্যাণ কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। আমরা যাদের রেমিট্যান্স নিয়ে গর্ব করি, যাদের পাঠানো অর্থ দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াই, উন্নয়নের গল্প লিখি, এমনকি ব্যক্তিগত বিলাসিতাও উপভোগ করি—সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্র কী করেছে, সেই প্রশ্ন আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

তাই সময় এসেছে “রেমিট্যান্স যোদ্ধা”দের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার। যেমন কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড রয়েছে, তেমনি প্রবাসীদের জন্য “রেমিট্যান্স কার্ড” চালু করা যেতে পারে। এই কার্ডের মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যাংকিং সুবিধা, আবাসন এবং বিশেষ ঋণ সুবিধা পেতে পারেন। এটি শুধু একটি সুবিধা নয়—এটি একটি সম্মান, একটি স্বীকৃতি।

প্রবাসীদের পরিবারের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। তাদের জন্য “ফ্যামিলি সাপোর্ট কার্ড” চালু করা গেলে খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে প্রবাসীরা মানসিকভাবে আরও নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। ফলে তারা আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন।

দক্ষতা উন্নয়ন এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক ভিত্তি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দক্ষতা, ভাষা জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। তাই কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ শ্রমিকই পারে বিদেশে সম্মানজনক কর্মপরিবেশ এবং উচ্চ আয়ের সুযোগ তৈরি করতে। অবশ্য বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রবাসীরা যেন কোনো সমস্যায় পড়লে দ্রুত আইনি সহায়তা, মানবিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা পান—এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। একটি কার্যকর “র‍্যাপিড রেসপন্স সিস্টেম” চালু করা গেলে প্রবাসীদের আস্থা অনেকটাই বাড়বে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শ্রম বিনিময় এখন পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে একটি সুসংগঠিত, স্বচ্ছ এবং মানবিক শ্রমনীতি গ্রহণ করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে রাখতে হবে যে, প্রবাসীরা কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম নন; বরং তারাই দেশের আসল নায়ক, আমাদের অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রদূত।

তাদের ঘামেই গড়ে ওঠে অর্থনীতির ভিত, তাদের ত্যাগেই টিকে থাকে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। তাই সময় এসেছে—এই নায়কদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালনের। দালালমুক্ত, স্বচ্ছ এবং মানবিক শ্রমবাজার গড়ে তোলা এখন একটি জাতীয় প্রয়োজন বলেই মনে হচ্ছে। একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না যে, যাদের রেমিট্যান্স দিয়ে আমরা দেশ চালাই সেইসব রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জীবনটাকেও সম্মান দিয়ে সাজানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]

জনি

২ মাস আগে

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও সম্মান দিন: দালালমুক্ত শ্রমবাজারের বিকল্প নেই,শতভাগ্ ঘুষের দেশে এগুলা সম্ভব নয়,রাষ্ট্র একটা পাসপোর্ট দিতে পারেনা!আপনি সুরক্ষা চাচ্ছেন!কষ্ট করে বিদেশে যাওয়া এয়ারপোর্টে আসার পর ব্যাংক কাটাকাটি!

মন্তব্য করুন