ব্লেসিং মুজারাবানিকে প্রথম দেখলে আপনার নজর কাড়বে তার উচ্চতা। লম্বায় তিনি ছয় ফুট আট ইঞ্চি। অথচ এই কিশোরকে লম্বার মাপকাঠিতে নয় চোখের ক্ষুধায় আবিষ্কার করেছিলেন জিম্বাবুয়ের সাবেক অধিনায়ক টাটেন্ডা টাইবু। হারারের হাইফিল্ড শহরতলির তাকাশিঙ্গা ক্রিকেট ক্লাবে মুজারাবানির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় টাইবুর। দরিদ্রতায় জর্জরিত মুজারাবানি অপুষ্টির শিকার ছিলেন। তবে সেই ক্ষুধার চেয়েও বড় ছিল জীবন বদলে ফেলার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আজ কলম্বোর মাঠে সেই ক্ষুধারই প্রতিফলন দেখলো ক্রিকেট বিশ্ব। ২৯ বছর বয়সী এই পেসারের গতির ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া।
মুজারাবানির বয়স যখন সাত, তখন তুতো ভাই তৌরাইয়ের সঙ্গে তাকাশিঙ্গায় প্রথম বোলিং করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন তার পায়ে কোনো ক্রিকেট জুতো ছিল না। এমনকি পরের দিন কিংবা তার পরের দিনও নয়। হারারের তপ্ত কংক্রিটে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে মুজারাবানি দেখতেন, বিত্তবান ঘরের ছেলেরা গাড়ি থেকে নামছে দামী সব সরঞ্জাম নিয়ে। মুজারাবানি সেই দিনগুলোর কথা ক্রিকেট মান্থলির এক রিপোর্টে উঠে এসেছিল। সেই সময় মুজারাবানি বলেন, ‘সেটা সত্যিই খুব কঠিন ছিল। কখনও কখনও আপনাকে ধনী এবং দরিদ্র বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে হয়। একজন শিশু হিসেবে এটি আপনাকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। আপনি দেখেন তারা কী ধরণের জুতো পরেছে। আপনারও সেগুলো পেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমার কাছে তা কেনার কোনো উপায় ছিল না।’ তবুও হাল ছাড়েননি মুজারাবানি। তিনি বলেন, ‘আমার জুতো বা ব্যাট আছে কিনা সেদিকে আমি পাত্তা দিতাম না। আমি কেবল বাইরে গিয়ে বোলিং করা এবং যা ভালোবাসি তা করার দিকে মনোনিবেশ করেছিলাম।’
টাইবু একসময় জিম্বাবুয়ের নির্বাচক ছিলেন। প্রথম দেখায় মুজারাবানিকে খুব শান্ত ও লাজুক মনে হওয়ায় প্রায় বাদই দিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এক মাস ধরে টাইবু তাকে পর্যবেক্ষণ করেন। টাইবু বলেন, ‘জীবনে ও যা কিছুর মধ্য দিয়ে গেছে, ও আর সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে চায় না।’
২০১৮ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে জিম্বাবুয়ের বাদ পড়া মুজারাবানিকে বড়োসড়ো আঘাত করে। এর পরপরই বোর্ডের আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে তিনি ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেটের সঙ্গে চুক্তি করেন। তখন অনেকেই মুজারাবানির দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। কিন্তু দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়া মুজারাবানির কাছে সেটি ছিল স্রেফ বেঁচে থাকার লড়াই। তিনি বলেন, ‘আমি জানি যদি আমি ভালো না করতাম, তবে আমি এমন একটি সুযোগ নষ্ট করতাম যা আমাকে আমার জীবনে সত্যিই সাহায্য করছিল।’
ইংল্যান্ডে নর্দাম্পটনশায়ারে খেলার সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজের জেসন হোল্ডারের সান্নিধ্য পান তিনি। হোল্ডার তাকে শিখিয়েছিলেন লম্বা শরীরের সুবিধা কীভাবে নিতে হয়। মুজারাবানি বলেন, ‘ইংল্যান্ডে খেলা আমাকে আমার বৈচিত্র্যগুলো ব্যবহার করতে সাহায্য করেছে। ইয়র্কার বা স্লোয়ার বল কখন দিতে হবে, সেই মুহূর্তগুলো আপনি বুঝতে পারেন।’
আজ শ্রীলঙ্কার ভ্যাপসা গরমে সেই ক্ষুধার্ত মুজারাবানিই হয়ে উঠেন অদম্য। তার বাউন্সার আর গতির জাদুতে একে একে সাজঘরে ফেরেন জশ ইংলিস ও টিম ডেভিড। পরে ফিরে এসে দারুণ এক স্লোয়ারে ফেরান ম্যাট রেনশকে এবং উপড়ে ফেলেন অ্যাডাম জাম্পার লেগ স্টাম্প। অজিদের ইনিংস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয় জিম্বাবুয়ের ঐতিহাসিক জয়োল্লাস।
