বাংলাদেশে রাজনৈতিক জীবন ওলটপালট করে দেয়া ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের আঠারো মাস পর বহু প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচন অবশেষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেকেই একে নতুন এমন এক যুগের সূচনা হিসেবে উদ্যাপন করছেন, যে যুগে প্রভুত্ব করবে জনগণ। সংসদে সবচেয়ে বড় দুটি দল হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী (জেআই)। বিএনপির নেতা তারেক রহমান সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছেলে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। তার মা, প্রয়াত খালেদা জিয়া, নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজার দশকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী কার্যত ‘মৃত্যুদশা থেকে ফিরে এসেছে’। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার দায়ে তাদের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ে একমাত্র প্রকৃত ‘নতুন’ শক্তি ছিল ছাত্রনেতৃত্ব, যারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তাদের একটি অংশ সম্প্রতি গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করছে, যা নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়েছে।
নির্বাচনের দিন ভোটাররা দুটি পৃথক ব্যালটে ভোট দেন। একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি ব্যাপক সাংবিধানিক সংশোধনী আনার গণভোট হিসেবে। এর আগে বাংলাদেশে তিনবার গণভোট হয়েছে। এর মধ্যে দু’টি ছিল বিশৃঙ্খল এবং সামরিক শাসনকে বৈধতা দেয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা। বর্তমান গণভোটটি হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর। দেখা বাকি, বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কার পাকিস্তানের ২৬তম ও ২৭তম সংশোধনীর মতো বিতর্কিত রূপ নেয় কি না।
বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতোই, একটি অত্যন্ত তরুণ দেশ। প্রায় ১২ কোটি ভোটারের অন্তত অর্ধেকই আগে কখনো ভোট দেননি। শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন অনেক তরুণের জন্য ছিল প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার মুহূর্ত। ভোটের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে অধিকাংশ ভোটার ‘দুর্নীতি’ বিরোধী স্লোগানে প্রভাবিত হয়েছেন, যা বহু পুরোনো অথচ প্রায়শই ফাঁপা প্রতীকী ভাষ্য। অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী তিন প্রধান রাজনৈতিক দল- কেউই গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কথা স্পষ্টভাবে বলেনি, যেমন স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর রপ্তানিমুখী পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা কিংবা সামরিক, বেসামরিক ও বিচারিক আমলাতন্ত্রের ক্ষমতার প্রশ্ন।
উপমহাদেশের অন্য প্রান্তে, পাকিস্তানের ক্ষমতাকাঠামো ও মূলধারার বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে দেখেছেন- ভারতঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগের পতন এবং ডানপন্থী শক্তির পুনরুত্থান তাদের কাছে আদর্শগতভাবে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। লক্ষণীয় যে, বিএনপি ও জামায়াত খুব কমসংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। ফলে পাকিস্তানের প্রগতিশীল শক্তিগুলোর পক্ষে বাংলাদেশের বর্তমান গতিপথে উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ কম। বিশেষত জামায়াতের পুনরুত্থান ১৯৭১ সালের স্মৃতি উসকে দেয়। সে ঘটনাকে পাকিস্তানে এখনো অনেকেই কেবল ভারতীয় ষড়যন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন; বাঙালি জনতার আকাক্সক্ষা সেই বয়ানে প্রায় অনুপস্থিত। একইভাবে, বেলুচিস্তানের পরিস্থিতিকে এখনো ‘বিদেশি হাত’-এর ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখা প্রমাণ করে যে ১৯৭১ থেকে খুব বেশি শিক্ষা নেয়া হয়নি।
পাকিস্তানের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা বারবার ভোটের ফল কারচুপি বা সরাসরি দমনপীড়নের মাধ্যমে রুদ্ধ হয়েছে। আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীনদের সরিয়ে ‘নতুন’ মুখ আনা কখনো কখনো অন্তর্নিহিত ক্ষমতার কাঠামোকেই আরও শক্তিশালী করে, পরিবর্তন আনে না।
বাংলাদেশের তরুণরা, যারা ২০২৪ সালের আগস্টে দেখিয়েছে যে বিপ্লবী কল্পনা এখনো জনগণের সম্মিলিত রাজনীতিকে উদ্দীপ্ত করতে পারে, তাদের সামনে এখন কঠিন দায়িত্ব- নবনির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখা, তরুণ শ্রমজীবীদের অর্থনৈতিক চাহিদা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে। তবু সত্য এই যে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ পাকিস্তানের তরুণদের ওপর নেমে আসা হতাশার তুলনায় বেশি উন্মুক্ত ও আশাব্যঞ্জক মনে হয়।
এই হতাশার কারণ শুধু রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ বা পিএমএল-এন ও পিপিপির ভূমিকা নয়। দুই দেশের পার্থক্য এবং বিশেষত তরুণদের সংগঠিত শক্তির পেছনে একটি বড় কারণ হলো- বাংলাদেশে ছাত্র ইউনিয়নগুলো সক্রিয় রয়েছে। অথচ পাকিস্তানে ৪২ বছর ধরে এই মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ। ক্ষমতাধরদের এবং তাদের সহযোগীদের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এমন সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে আমাদেরও প্রয়োজন এমন গণতান্ত্রিক শিক্ষালয়।
(লেখক কায়দে আযম ইউনিভার্সিটি, ইসলামাবাদের শিক্ষক। তার লেখাটি অনলাইন ডন থেকে অনুবাদ।)
