চৈত্র শেষের তপ্ত দুপুরে উত্তরাঞ্চলের জনপদ এখন আগুনের কুণ্ডলি হয়ে উঠেছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে মৃদু তাপপ্রবাহ চলছে। দিনের তাপমাত্রা দুই বিভাগে প্রায় কাছাকাছি। ৩৭-৩৮ ডিগ্রিতে ওঠা-নামা করছে। এতে সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরছে। বিশেষ করে শহরের পিচঢালা রাজপথ আর যমুনা তীরের চরাঞ্চলের মানুষের জন্য এই তপ্ত আবহাওয়া চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। ঈদের ছুটি কাটিয়ে মানুষ যখন পুরোদমে কাজে ফিরেছে, ঠিক তখনই সূর্যের এই রুদ্রমূর্তি খেটে খাওয়া মানুষের সব হিসাব ওলটপালট করে দিচ্ছে। বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা থেকে শুরু করে প্রতিটি অলিতে-গলিতে এখন আগুনের আঁচ সরাসরি চোখেমুখে লাগছে। এই উত্তপ্ত রাজপথে রিকশার হ্যান্ডেল ধরে লড়াই করছেন শত শত রিকশাচালক। রিকশার সিট এতটাই গরম হয়ে উঠেছে যে সেখানে বসা দায়। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছে কেউ যেন গায়ের ওপর গরম বাতাস ছিটিয়ে দিচ্ছে। এই তীব্র গরমে যাত্রীও মিলছে অনেক কম। মানুষ রোদের ভয়ে খুব জরুরি কাজ ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না। শহরের ঠনঠনিয়া বা বনানী মোড়ে বিশ্রাম নেয়া রিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোদের তাপে পিচঢালা রাস্তা থেকে যে ভাপ উঠছে- তাতে বেশিক্ষণ প্যাডেল চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তবুও পরিবারের টানে এই তপ্ত পিচের ওপর চাকা ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
শহরের এই যান্ত্রিক উত্তাপের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি কষ্ট সইতে হচ্ছে বগুড়ার ধুনট ও সারিয়াকান্দি, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষকে। যমুনার দিগন্তজোড়া বালুচর এখন উত্তপ্ত মরুভূমি। এখানকার কৃষকরা এখন বোরো ধানের আবাদ আর পরিচর্যা নিয়ে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন। কিন্তু রোদ আর বালুর তাপে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। চরের বালু এতটাই গরম হয়ে উঠেছে যে জুতা ছাড়া সেখানে এক কদম হাঁটা কঠিন। কৃষকরা খুব ভোরে মাঠে কাজ শুরু করলেও দুপুরের আগেই রোদের তীব্রতায় কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ছায়াহীন বিশাল চরে একটু জিরিয়ে নেয়ার মতো শীতল জায়গাটুকুও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
সারিয়াকান্দির চালুয়াবাড়ি কিংবা ধুনটের ভাণ্ডারবাড়ি এলাকার কৃষকরা জানালেন যে, এবার রোদের তেজে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। একদিকে সেচের পানির সংকট আর তীব্র লোডশেডিং, অন্যদিকে অসহ্য গরম। তপ্ত হাওয়ায় বোরো ধানের শীষ শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেচ পাম্পগুলো একটানা চালিয়েও মাটিকে ভেজানো যাচ্ছে না। চরের টিনের ঘরগুলো যেন একেকটি গরম চুল্লিতে পরিণত হয়েছে। দুপুরের পর ঘরের ভেতরে থাকা আর আগুনের পাশে বসে থাকা একই কথা। বিশেষ করে শিশু আর বৃদ্ধদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয় হয়ে পড়েছে। চরের মানুষের জীবন এমনিতেই সংগ্রামের, কিন্তু এই চলমান তাপপ্রবাহ তাদের সেই সংগ্রামকে আরও বহুগুণ বিষিয়ে তুলেছে।
এই অসহ্য গরমের সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কাঁচাবাজারগুলোতেও। রোদের তাপে সবজি ও ফলমূল দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন যে তীব্র গরমের কারণে মানুষ দুপুরের পর বাজারে আসতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের বেচাবিক্রি অনেকটাই কমে গেছে। বিশেষ করে যারা খোলা আকাশের নিচে বসে ব্যবসা করেন, তাদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। তপ্ত আবহাওয়ায় অনেক পচনশীল পণ্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই বাড়তি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবমিলিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এই তীব্র গরম কেবল শারীরিক কষ্ট নয়, বরং মানুষের রুটিরুজিতেও বড় আঘাত হয়ে এসেছে। চৈত্রের এই রুদ্রমূর্তি দেখে কৃষকের মনে ফসলের দুশ্চিন্তা আর শ্রমিকের মনে আয়ের হাহাকার। মেঘহীন নীল আকাশে এখন এক চিলতে বৃষ্টির প্রত্যাশা সবার চোখেমুখে। প্রকৃতি যদি শিগগিরই সদয় না হয়, তবে এই তাপপ্রবাহের ফলে জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবার প্রার্থনা এখন শুধু এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টির জন্য।
চৈত্রের তপ্ত রোদে ওষ্ঠাগত উত্তরের শ্রমিকের প্রাণ
প্রতীক ওমর, উত্তরাঞ্চল ঘুরে
৫ এপ্রিল (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
