যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ‘ইরানকে পরাজিত করে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে’ প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকানদের উদ্দেশে এ কথা বলার ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তেহরান মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এর ফলে ইরানের ভেতরে গভীরে আটকে পড়া দুই মার্কিন সেনাসদস্যকে উদ্ধারে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান শুরু করতে হয়েছে। এই অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তাকারী দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং একটি আক্রমণকারী জেটেও হামলা চালিয়েছে ইরান। এই ভয়াবহ ঘটনাগুলো যুদ্ধের দ্বিতীয় মাসে প্রবেশের সময় প্রেসিডেন্টের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে তুলেছে। তাহলো প্রতিদিন বোমা হামলা এবং বিজয়ের দাবি সত্ত্বেও, ইরান এখনও এমন সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে যা মার্কিন সেনা সদস্য এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও সম্পদের ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে পারে। এ সপ্তাহে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের (ইরান) কোনো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। তাদের রাডার শতভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা সামরিক শক্তি হিসেবে অপ্রতিরোধ্য।’
তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তির মতে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনও অক্ষত রয়েছে এবং তাদের অস্ত্রাগারে হাজার হাজার একমুখী আক্রমণ ড্রোন রয়েছে।
এছাড়া ইরানের মাটির নিচে থাকা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারও অক্ষত রয়েছে। তারা এখনও ওই অঞ্চলজুড়ে জলপথে চলাচলকারী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাতে সক্ষম।
স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিয়েকো বলেন, তারা (ইরান) যে হারে এখন হামলা চালাচ্ছে, তাতে তারা আরও কিছু সময় এটি চালিয়ে যেতে পারবে। তিনি আরও বলেন, ইরান তাদের অস্ত্র লুকানোর ক্ষেত্রেও আরও দক্ষ হয়ে উঠছে।
শুক্রবার এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানে ইরানের হামলা ছিল কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম ঘটনা, যখন শত্রুপক্ষের গুলিতে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলো। দুই সেনাসদস্যের একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যজনের খোঁজ চালাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে থাকা মার্কিন সদস্যরা সামান্য আহত হয়েছেন এবং আক্রমণকারী এ-১০ থান্ডারবোল্ট বিমানের পাইলট কুয়েতের আকাশে নিরাপদে অবতরণ করেছেন বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এ ঘটনাগুলো আমেরিকানদের জন্য যুদ্ধে সম্ভাব্য একটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, হোয়াইট হাউস যেভাবে যুদ্ধের পরিস্থিতি তুলে ধরছে মার্কিন সাফল্যকে জোর দিয়ে এবং ইরানের হুমকিকে কম দেখিয়ে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এক জ্যেষ্ঠ হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলকে হোয়াইট হাউসে ডেকে চলমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেননি।
এ সপ্তাহের শুরুতে হোয়াইট হাউস দাবি করে, ইরান আর তাদের নিজস্ব আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করে না। সোমবার প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, মার্কিন ও ইসরাইলের যৌথ বাহিনী আকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ইরানের ওপর আকাশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে।
কিন্তু বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে ট্রাম্প ‘দ্রুত, সিদ্ধান্তমূলক, ব্যাপক বিজয়’-এর কথা বলেন। এরপর থেকেই ইরান কমপক্ষে ৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৫০টির বেশি ড্রোন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে এনবিসি নিউজের হিসাব। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ১৬টি মার্কিন রিপার ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে। এর মধ্যে এ সপ্তাহেই দুটি ধ্বংস হয়েছে বলে ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং তার প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করছে এমন একটি তুলনামূলক সহনশীল সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তবে যুদ্ধ কিভাবে বা কখন শেষ হবে, সে বিষয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সময়ে তেলের দাম বাড়ছে। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালিতে ড্রোনসহ স্বল্পমূল্যের অস্ত্র ব্যবহার করে তেল সরবরাহে বাধা দেয়ার সক্ষমতা রাখে। শুক্রবার ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেন, এফ-১৫ই ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা আলোচনায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তবে ইরান বলছে, কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না। একাধিক পশ্চিমা কর্মকর্তা, মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং নিহত নেতাদের উত্তরসূরিরা সমানভাবে কট্টরপন্থী বা আরও বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থানের বলে জানা গেছে।
যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা বিশেষ করে মার্কিন সামরিক সাফল্যের মাত্রা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুব কম তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। সাধারণ কিছু তথ্য ও ভিডিও প্রকাশ করা হলেও, অতীতের মতো কোনো স্বাধীন গণমাধ্যমকে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়নি।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, ইরানের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের কিছু অংশে যুক্তরাষ্ট্র আকাশসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে পূর্বাঞ্চলে এখনো নয়। কেলি গ্রিয়েকো বলেন, পূর্বাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই এবং ইরান অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে ড্রোন, লুকানো ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, সমুদ্র মাইন ও ছোট আক্রমণ নৌকা দিয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ইরানের এখনও সক্ষমতা ও শক্তি রয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, তারা এই সক্ষমতা দিয়ে কী করতে পারে। আমরা যা দেখছি, তা হলো আকাশ ও সমুদ্রপথে অসম যুদ্ধের বাস্তব চিত্র।
শুক্রবার ইরানের গণমাধ্যম ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসের দাবি অনুযায়ী এফ-১৫ই ভূপাতিত করার ছবি প্রকাশ করে। পরে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ক্বালিবাফ এক্সে ট্রাম্পকে কটাক্ষ করেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইরানকে টানা ৩৭ বার হারানোর পর, তারা যে কৌশলহীন যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা এখন ‘শাসন পরিবর্তন’ থেকে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ‘এই! কেউ কি আমাদের পাইলটদের খুঁজে দিতে পারবে?’- কী অসাধারণ অগ্রগতি! একেবারে প্রতিভাবান!’ এখনও একজন মার্কিন সেনাসদস্য নিখোঁজ রয়েছেন।
এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে। কারণ মিত্ররা এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এটা এমন এক যুদ্ধ যেখানে যোগদানের আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। এ সপ্তাহে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদেরও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ন্যাটো সদস্যদের সাহসের অভাব বলে আখ্যা দেন এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করায় নেতৃত্ব না দেয়ায় তাদের সমালোচনা করেন। এছাড়া বৃটেন, ফ্রান্স ও স্পেন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ। ন্যাটোর মহাসচিব আগামী সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার কথা রয়েছে।
