সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার অধিকাংশ হাওরে টানা বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে অপরিপক্ব বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অপরিকল্পিত ফসল রক্ষা বাঁধ ও পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকদের গোলায় এবার ধান উঠবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ইতিমধ্যে নিচু এলাকার অনেক হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের ভেতরে পানি আটকে ধানি জমি তলিয়ে কাঁচা ধানে পচন ধরতে শুরু করেছে। কয়েকটি হাওরে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে পাম্প মেশিন বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করলেও বৃষ্টির পানিতে আবার জমি ডুবে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
সরজমিন দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ হাওরের জমিতে কোথাও কোমর সমান, কোথাও বুক সমান পানি জমে আছে। পানির নিচে ডুবে থাকা অপরিপক্ব ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার ৮২টি গ্রামের কৃষকরা। ধর্মপাশা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর উপজেলায় ১৮ হাজার ২৯০ হেক্টর এবং মধ্যনগরে ১৩ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। শুধু টগার হাওরেই প্রায় ২ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে টগার হাওরসহ বিভিন্ন ছোট-বড় হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং প্রায় ২৯৫ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। টাঙ্গুয়া হাওরপাড়ের ৮২টি গ্রামের কৃষকদের স্বপ্ন ভেঙে যেতে বসেছে। নজরখালী বাঁধ অরক্ষিত থাকায় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নিচু জমির ফসল তলিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষক সোনা মিয়া বলেন, গত বছর ঋণ ছিল, এবার আরও ৫০ হাজার টাকা ঋণ করেছি। ফসল নষ্ট হলে ঋণ শোধ করবো কীভাবে।
সুখাইড় রাজাপুর ইউপি চেয়ারম্যান সুহেল মিয়া বলেন, প্রতিটি হাওরের চার ভাগের এক ভাগ ফসল ডুবে গিয়ে তা পচতে শুরু করেছে। ক্রমাগত বৃষ্টি হলে হাওরেও পানি বাড়বে। এতে বিপদ আরও বাড়তে পারে। জামালগঞ্জ উপজেলার ভান্ডা বিল, পাগনা, চাকায়া ও নলছুন্নীসহ বিভিন্ন হাওরে ধানের চারা পানিতে ডুবে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর ৪৫ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৫৬ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আরও ১২৫ হেক্টর জমি আংশিক ক্ষতির মুখে রয়েছে। অন্যদিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের একটি বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
অনেক জমিতে ধানের শিষ পর্যন্ত ডুবে আছে। জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান তালুকদার বলেন, এ ইউনিয়নের দিঘার হাওর, ভান্ডা-মল্লিকপুর হাওর, টাকুরাই-করিমপুর হাওর, কুড়ালিয়া হাওর জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো ব্যবস্থা নেই। কৃষকরা নিজস্ব উদ্যোগে পাওয়ার পাম্প বসিয়ে জ্বালানি তেল জ্বালিয়ে ফসল বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ছাত্তার মিয়া বলেন, নজরখালী বাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় না থাকায় প্রতি বছর কৃষকদের নিজস্ব অর্থে বাঁধ নির্মাণ করতে হয়। এবার অর্থ সংকটের কারণে বাঁধের কাজ ঠিকমতো করা সম্ভব হয়নি।
তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদ মুরাদ বলেন, শুধু নজরখালী বাঁধই নয়; গুমার বর্ধিতাংশ, গলগলিয়া বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় আনার জন্য বিগত সরকারের আমলে একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কিন্তু কাজ হয়নি। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, আগামী ৭ দিনের মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম। তবে ৭ই এপ্রিলের পর ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, বাইরের পানি ঠেকাতে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। তবে জলাবদ্ধতা কমাতে উপযুক্ত স্থানে স্লুইস গেট নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
