কালাইয়ে ঋণ না নিয়েও ‘ঋণখেলাপি’

ফন্ট সাইজ:

জয়পুরহাটের কালাইয়ে অগ্রণী ব্যাংকের একটি শাখায় ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। যেখানে বহু বছর আগে মৃত ব্যক্তিদের নামেও কৃষিঋণ দেখিয়ে কোটি টাকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। হঠাৎ করে ভুক্তভোগীদের বাড়িতে ঋণ পরিশোধের লাল নোটিশ পাঠানোর পরই সামনে আসে দীর্ঘদিনের এই অনিয়ম। আঁওড়া মহল্লার বাসিন্দা নুর আলম মণ্ডল জানান, তিনি কোনোদিন ব্যাংকে যাননি, এমনকি তার নামে কোনো জমিও নেই। অথচ তার নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ২০১৬-২০১৭ সালে তার নামে কৃষিঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে। একইভাবে বহু মানুষ হঠাৎ নোটিশ পেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়েন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লা এবং আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের ঝামুটপুর ও হারুঞ্জা গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তির নামে এসব ঋণ দেখানো হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে কখনো ঋণ নেননি, আবার অনেকেই ১৫ থেকে ২০ বছর আগে মারা গেছেন। ব্যাংকের নথিতে দেখা যায়, এসব ঋণ ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অনুমোদন দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক মো. নুরুল ইসলাম স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও ছবি সংগ্রহ করে ভুয়া জমির কাগজপত্র তৈরি করেন। এরপর কোনো ধরনের যাচাই বাছাই ছাড়াই ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলন দেখানো হয়। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ঋণগ্রহীতার উপস্থিতিতে যাচাই, স্বাক্ষর বা টিপসই নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি।
মৃত ব্যক্তিদের মধ্যেও একাধিক নাম রয়েছে। আঁওড়া মহল্লার আব্দুর রাজ্জাক হোসেন মোল্ল্যা, যিনি প্রায় ১৫ বছর আগে মারা গেছেন, তার নামেও ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে। যা সুদে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তার ছেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাহলে কি আমার বাবা কবর থেকে উঠে এসে ঋণ নিয়েছেন? একই অভিযোগ করেছেন হারুঞ্জা গ্রামের ফজলুর রহমান, যার মৃত বাবার নামেও ঋণ দেখানো হয়েছে। জীবিত ভুক্তভোগীদের মধ্যেও অনেকে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ভ্যানচালক পুতুল চন্দ্র জানান, ঋণের জন্য আবেদন করলেও পরে তা বাতিল হয় বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি দেখতে পান, তার নামেই ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। গৃহকর্মী জাহানারা বেগম বলেন, তিনি কখনো ব্যাংকে না গেলেও তার নামে ঋণ দেখানো হয়েছে এবং স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। এ ঘটনায় দালাল হিসেবে অভিযুক্ত আব্দুস সামাদ স্বীকার করেছেন, তিনি এলাকার মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও ছবি সংগ্রহ করে তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে দিতেন এবং প্রতিবার দুই হাজার টাকা করে পেতেন। তিনি জানান, আর্থিক সংকটের কারণে তিনি এ কাজে জড়িয়ে পড়েন এবং অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জনের তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। ২০১৬-২০১৭ সালে দায়িত্বে থাকা তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট দুই ফিল্ড সুপারভাইজারকে তলব করা হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নূরুল ইসলামের অবসরকালীন সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা স্থগিত রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এক ফিল্ড সুপারভাইজার দাবি করেছেন, তৎকালীন ব্যবস্থাপক চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে তাদের দিয়ে কাগজপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। তারা বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করলেও প্রকৃতপক্ষে কার নামে কতো টাকা ঋণ তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। তবে অভিযুক্ত তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি অনেক পুরনো হওয়ায় তার মনে নেই এবং এটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার নিজস্ব বিষয়। সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য কি করতে হবে বলেন! অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক মো. জুলফিকার আলী জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কিছু অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে এবং তদন্ত শেষে জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ সংশ্লিষ্টদের পেনশন থেকে সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন