ফেনীতে দৈনিক চাহিদা আড়াই লাখ লিটার, সরবরাহ ৫০ হাজার

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে ফেনীতে দেখা দিয়েছে অকটেনের তীব্র সংকট। জেলার ২৮টি পেট্রোল পাম্পে দৈনিক পেট্রোল-অকটেন ও ডিজেলের চাহিদা প্রায় আড়াই লাখ লিটার। আর দিনে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার লিটার। এতে প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে দুই লাখ লিটার জ্বালানি তেল। জেলার সব পাম্পে গত শুক্রবার থেকেই মিলছিল না পেট্রোল-অকটেন। পাম্প কর্তৃপক্ষ কালো কাপড় ও রশি লাগিয়ে তেল বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়। অকটেন আনতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডিপোতে গাড়ি পাঠানো হয়েছে জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন- গাড়ি তেল নিয়ে ফেনী পৌঁছাতে মঙ্গলবার সকাল হতে পারে। তাদের এখানে ডিজেল থাকলেও অকটেন নেই। এদিকে, অবৈধ পাচার, চোরাচালান প্রতিরোধ, জ্বালানি তেলের সরবরাহ, মজুত ও বিক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে জেলার ছয় উপজেলার ২৮টি ফিলিং স্টেশনে ২৮ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

গত রোববার রাতে জেলা প্রশাসক মনিরা হক স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ সিদ্ধান্তের তথ্য জানানো হয়। ট্যাগ অফিসারদের জন্য একাধিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাদেরকে ফিলিং স্টেশনের দৈনিক মজুত রেজিস্টার সংরক্ষণ ও যাচাই, ডিপো থেকে সরবরাহকৃত তেল সঠিকভাবে গ্রহণ ও হিসাব মেলানো, ডিপস্টিক-ডিপরডের মাধ্যমে সরবরাহকৃত তেল বুঝে নেয়া, মিটার রিডিং ও বিক্রয় হিসাব পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিদিন অন্তত তিনবার তদারকি করতে বলা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনার আলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জেলার প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের তেল মজুত, সরবরাহ ও বিক্রয় কার্যক্রম নিয়মিত তদারকির জন্য বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট পাম্পে ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সরজমিন দেখা যায়, ফিলিং স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে প্রাইভেটকারের জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা ও মোটরসাইকেলের জন্য ২০০ টাকার তেল দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা কাজ করছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শহরের জেল রোডস্থ মেসার্স আবদুল কুদ্দুস ফিলিং স্টেশনে অভিযান চলাকালে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনজন মোটরসাইকেলচালককে ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া হেলমেট ছাড়া চালকদের সচেতন করতেও দেখা যায়। ফেনী জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার চয়ন বড়ুয়া বলেন- সরকারি বিধি অনুযায়ী ফিলিং স্টেশনগুলো তেল বিক্রি করছে কিনা তা নজরদারির পাশাপাশি চালকদের বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে। সংকটের মধ্যে সকলে যেন সমানভাবে জ্বালানি পায়, সেই লক্ষ্যেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিকে অকটেনচালিত পাম্প নিয়ে নতুন সংকটে পড়েছেন চাষিরা। বোতল বা কনটেইনারে অকটেন দিচ্ছেন না পাম্পের কর্মীরা। বাধ্য হয়ে জেলা বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, সেনবাগ, চট্টগ্রামের মিরসরাই, জোরারগঞ্জ ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কৃষকরা ফেনীর ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছেন। সারাদিন অপেক্ষার পর কেউ কেউ দুই থেকে চার লিটার তেল পেলেও অনেকে ফিরছেন খালি ড্রাম ও বোতল নিয়ে। কৃষকরা বলছেন, পানি দেয়ার পাম্প অকটেনচালিত। তেলের অভাবে মেশিন চালাতে পারছেন না। ফলে ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এদিকে তেলের পাম্পগুলোতে বোতলে তেল বিক্রি করছে না। তাই ২০০ টাকা দিয়ে অটোরিকশা ভাড়া করে পাম্পে সেচের মেশিন নিয়ে আসছেন অনেকে। মেসার্স আবদুল কুদ্দুছ ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মোর্শেদ বলেন, মার্চের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু তৃতীয় সপ্তাহে ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। চাহিদাও তিনগুণ বেড়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডিপো থেকে প্রতিদিন বিকালে পাম্পে তেল পৌঁছালেও তা তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ডিপোতে অকটেনের চাহিদাপত্র দিলেও তারা ডিজেল দিয়েছে। চট্টগ্রাম ডিপো থেকে অকটেন দেবে জানালে রোববার বিকালে গাড়ি পাঠিয়েছেন। গাড়ি এলে বিক্রি করা হবে। জেলা প্রশাসন কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে তেল দিতে বলেছে। তা পাম্প কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা মোটরসাইকেল মালিকদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে পারেন না। পুলিশ থাকলে তা করছে।

জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন- ফেনীতে পেট্রোল পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল পাওয়ার বিষয়ে পাম্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে। তেলের চাহিদা পূরণে চেষ্টা চলছে। রোববার থেকে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ হয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে সমস্যাগুলোর সমাধান হতে পারে। এর আগে, গত ২৫শে মার্চ রাতে ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে রেজিস্ট্রেশন সনদ, ফিটনেস সনদ ও চালকের হালনাগাদ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের মোটরযানে জ্বালানি তেল সরবরাহ না করতে ফেনীর পেট্রোল পাম্প, প্যাকড পয়েন্ট ও এজেন্সিগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়।

এ বিজ্ঞপ্তির পর থেকে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান পরিচালনা করতে দেখা গেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন