জ্বালানি তেলের ডিপোতে নিরাপত্তা জোরদার
তেল ডিপোগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার- ছবি: শাহীন কাওসার

জ্বালানি তেলের ডিপোতে নিরাপত্তা জোরদার

ফন্ট সাইজ:

জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যে সারা দেশে অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ডিপোতে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। কোথাও কোথাও সেনা সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন। পাম্পগুলোতে তদারক কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে আজ জাতীয় সংসদে বিবৃতি দেবেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। পরিস্থিতির উপর সতর্ক নজর রাখতে এমপিদের গতকাল নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দেশে প্রতিদিন গড়ে ডিজেলের চাহিদা ১২ হাজার টন। পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন। মার্চ মাসে দেশের তেলবাহী ১৭টি জাহাজ আসার কথা থাকলেও গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯টি জাহাজ এসে পৌঁছেছে। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে ২রা মে একটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতে সেটি আটকা পড়েছে। আরব আমিরাত থেকেও এক লাখ অপরিশোধিত তেল নিয়ে ২১শে মার্চ দেশের উদ্দেশ্যে আরও একটি জাহাজ রওনা দেয়ার কথা থাকলেও সেটির শিডিউলও বাতিল করা হয়। বৃহস্পতিবার ১০ হাজার টন ডিজেল ও ২০ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। ইউনিপেক নামের চীনের একটি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী এই তেল সরবরাহ করেছে। এমটি গ্রান কুভা নামের জাহাজে এই জ্বালানি তেল দেশে পৌঁছে।

জ্বালানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ভ্রাম্যমাণ আদালত: জ্বালানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে সরকার। সর্বশেষ একদিনে ২৯৩টি অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার তথ্য দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। এসব অভিযানে ৭৮টি মামলা দায়েরের পাশাপাশি মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

ফিলিং স্টেশনে তদারকি করবেন ‘ট্যাগ অফিসার’: জ্বালানি ব্যবস্থাপনা তদারকি ও সমন্বয়ে দেশের সব ফিলিং স্টেশনে একজন করে সরকারি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ‘ট্যাগ অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হবে। এই কর্মকর্তারা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ও বিপিসি নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাজ করবেন এবং দৈনিক প্রতিবেদন দেবেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় এ দায়িত্ব বণ্টন করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর বাইরে জেলা ও বিভাগীয় শহরে জেলা প্রশাসকরা এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওরা তাদের এলাকার প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের জন্য একজন করে সরকারি কর্মকর্তাকে ‘ট্যাগ অফিসার’র দায়িত্ব দেবেন। প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের জন্য ট্যাগ অফিসার’র দায়িত্ব দিয়ে তার তথ্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাকে অনুরোধ করা হয়েছে।

জ্বালানি ডিপোর নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ঠেকানোর পাশাপাশি বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে দেশের ৯ জেলার ১৯ ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গত বুধবার সকাল থেকে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা জেলায় ১টি, কুড়িগ্রামে ২টি, রংপুরে ৩টি, রাজশাহীতে ৩টি, সিলেটে ২টি, মৌলভীবাজারে ৩টি, কুমিল্লায় ৩টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১টি এবং সুনামগঞ্জে ১টি ডিপো রয়েছে। বিজিবি’র সদর দপ্তরের এক বার্তায় জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অননুমোদিতভাবে জ্বালানি তেল মজুতের ‘অপচেষ্টা’ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিজিবি সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। বিজিবি সদস্যরা অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্পে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে নিয়মিত তদারকি, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোর বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করছে।

আতঙ্কিত হয়ে তেল কিনতে বারন: শনিবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের বরাত দিয়ে তথ্য ও সমপ্রচার মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অতিরিক্ত লাভের আশায় যারা অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতকে ‘না’ বলার আহ্বান জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।

আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ক্রয় না করতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। এতে আরও বলা হয়, সরকার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় তেল ক্রয় করছে। ফলে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতির সম্ভাবনা নেই।
পাম্পে সরবরাহ বাড়ছে না, কিছু পাম্পে লম্বা লাইন: ওদিকে পাম্পগুলোতে তেলের অস্থিরতা কাটছে না। পাম্পের সামনে তেল নেই বলে নোটিশ ঝুলিয়ে বন্ধ রাখা হচ্ছে পাম্প। কোথাও কোথাও শুধুমাত্র ডিজেল বা পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে। আবার যেসব পাম্পে অকটেন পাওয়া যাচ্ছে সেখানে দেখা যাচ্ছে লম্বা লাইন। মঙ্গলবার সরজমিন মতিঝিল, বিজয় সরণি, আসাদগেট, পরিবাগ, মগবাজারসহ ঢাকার বেশ কয়েকটি তেলের পাম্প ঘুরে দেখা যায়- বেশ কয়েকটি পাম্প সকাল ৯টা থেকে ছিল বন্ধ। পাম্পের তেল দেয়ার মেশিনে অকটেন ও ডিজেল না থাকার নোটিশ ঝুলিয়ে রাখা ছিল। কয়েকটি পাম্প বন্ধ থাকায় যেগুলো খোলা ছিল সেগুলোতে সৃষ্টি হয় বাড়তি চাপ। এই চাপ সামলাতে নিয়ম অনুযায়ী রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করছে পাম্পগুলো। পাম্প কর্তৃপক্ষের তরফে বলা হচ্ছে, ডিপো থেকে স্টেশনগুলোতে ঠিকমতো তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না।

দুপুর ১২টায় দৈনিক বাংলা মোড়ের বিনিময় স্টেশনের তেল সরবরাহের মেশিনে অকটেন ও পেট্রোল নেই নোটিশ টাঙানো ছিল। একটায় মতিঝিল করিম এন্ড সন্স, মেঘনা ও রহমান ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, পাম্পগুলোতে তেল সংগ্রহে আসা যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। সেই লাইন প্রায় এক কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। তেল নিতে চালকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনেককে আবার সিয়িয়াল নিয়ে পাম্পে হট্টগোল করতে দেখা যায়। তেল সরবরাহের ঘাটতিতে ও চাহিদার চেয়ে বেশি তেল নেয়া রোধে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করছিল মতিঝিল এলাকার এসব পাম্পগুলো। পাম্পে মোটরসাইকেলের জন্য ৫০০ টাকার তেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১০ লিটার করে তেল দেয়া হচ্ছে। দুপুর ৩টায় রমনা ফিলিং স্টেশনে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় তেল বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল সাড়ে ৩টায় পরিবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় তেল সরবরাহের ঘাটতিতে ফিলিং স্টেশনটিতে তেল বিক্রি ছিল বন্ধ। তবে তার পাশেই মেঘনা মডেল সার্ভিসে তেল বিক্রি চলছিল। মেঘনা মডেল সার্ভিসে মোটরসাইকেলের জন্য ৫ লিটার, প্রাইভেট কার ১০ লিটার ও মাইক্রোবাসের জন্য ২০-২৫ লিটার তেল বিক্রি করা হচ্ছে। একই এলাকার পুর্বাচল ট্রেডার্সেও বন্ধ দেখা গেছে তেল বিক্রি। দুপুরের দিকে মগবাজারের মইন মটরসে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পটি বন্ধ হয়ে আছে।

মতিঝিল মেঘনা ফিলিং স্টেশনে কর্মরত কাইয়ুম হোসেন বলেন, ডিপো থেকে তেল সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। আমাদের চাহিদা ২২-২৩ হাজার লিটার তেল- সেই জায়গায় ৮ হাজার লিটার তেল পাচ্ছি। তেল আসলেই শেষ হয়ে যায়। চাপ সামলাতে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দিচ্ছি যেন সবাই তেল পায়। মোটরসাইকেলের জন্য ৫০০ টাকা ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলোকে ১০ লিটার করে তেল দিচ্ছি। সরকার থেকে তেলের দাম বাড়াবে না বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তাই যারা প্যানিক থেকে তেল কিনছিলেন তারা একটু শান্ত থাকবে। এখন থেকে আশা করি ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। পরিবাগ মেঘনা ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার মীর আজিম বলেন, আমাদের ডিপো থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। অনেকে চাহিদার চেয়ে বেশি এবং একাধিকবার তেল নিচ্ছেন এমন অনেককে পেয়েছি। তাই আমরা রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রয় করছি।

দুপুর ১টায় মতিঝিল মেঘনা ফিলিং স্টেশনে ১ হাজার টাকার তেল দেয়ার জন্য পাম্পকর্মীকে অনুরোধ করছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, প্রথমে গেলাম শাহবাগ সেখানে তেল না পেয়ে গেলাম রমনায়, সেখানে গিয়ে দেখি ওখানে তেল নেই এরপর আসলাম দৈনিক বাংলা মোড়ে সেখানেও তেল না পেয়ে এখানে আসছি। বাইক কিনে তো মনে হচ্ছে অন্যায় করে ফেলছি। দুপুর ৩টা রমনা ফিলিং স্টেশনে তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছিলেন মালেক উদ্দিন। তিনি বলেন, লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম- ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর যখন কাছাকাছি আসলাম তখন শুনি তেল শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন ফেরত যেতে হচ্ছে শুধু ১ ঘণ্টা সময় নষ্ট হলো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন