আলোচনা-সমালোচনার নামে এমন কিছু বলা ঠিক হবে না, যেটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো করে- এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলেছেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরব গাথা, তা নিয়ে আলোচনা হবে, গবেষণা চলবে- এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে আলোচনা-সমালোচনা কিংবা গবেষণার নামে এমন কিছু করা বা বলা অবশ্যই আমাদের জন্য ঠিক হবে না, যেটি আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরব ইতিহাস, তাকে কোনোভাবে খাটো করতে পারে। শুক্রবার রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপি’র উদ্যোগে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় দলের চেয়ারম্যান এ মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি শুরুতেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দকে কৃতজ্ঞতা জানাই। সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, আহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের সাহসী জনগণের অবদানকে স্মরণ করছি, যাদের অনন্য অবদানে আমাদের আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। সাধারণত এর আগেও যখন ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর বা এই ধরনের ঐতিহাসিক দিনগুলোর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগেও আমি দু-একবার একটি কথা আপনাদের সামনে বলেছিলাম, যে কথাটি আমি আপনাদের সামনে বলেছিলাম, সেটি ছিল এমন-অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ আর অতীতকে যদি আমরা ভুলে যাই তাহলে আমাদের দু’চোখে অন্ধ। সুতরাং আমরা যেমন অতীতকে একদম ভুলে যাবো না, ভুলে যাওয়া চলবে না, ঠিক একইভাবে অতীতেও আমরা দেখেছি, খুব বেশিদিন না, নিকট অতীতে আমরা দেখেছি যে, অতীত নিয়ে এত বেশি চর্চা হয়েছে, যেটা আমাদের সামনে ভবিষ্যৎ আছে, সেই ভবিষ্যতকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
তিনি বলেন, এখানে আলোচকবৃন্দ কয়েকজনই তাদের বক্তব্যে বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় আমাদের স্বাধীনতা এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের এই গৌরবজনক ইতিহাস নিয়ে আপনারা যারা আজকে মঞ্চে উপস্থিত যারা আলোচনা করেছেন, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন উপস্থিত আছেন- যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন, সেই সকল মুক্তিযোদ্ধা সরাসরি। আমরা যারা ছোট ছিলাম বা আমাদের সঙ্গে যারা ছিলেন, আমাদের থেকে একটু বড় ছিলেন, তারা আমরা বিভিন্নভাবে সেটি মিডিয়া হোক, বই পুস্তকের মাধ্যমে, বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে আমরা সেটি দেখেছি। কিন্তু আমাদের মহাসচিব তার বক্তব্যে বলে গেছেন, শেষ পর্যন্ত তৎকালীন বিশ্বে অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম এই বাংলাদেশের মানুষ।
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অনিবার্য চরিত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আমরা দেখেছি, অতীতে যেভাবে শহীদ জিয়াউর রহমানকে, তার অবদানকে, তার কাজকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে- এর থেকেই প্রমাণিত হয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অবশ্যই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অনিবার্য চরিত্র। কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হঠাৎ করেই কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণাটি দেননি। শহীদ জিয়া প্রথম জীবনে অবশ্যই একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তিনি একজন সামরিক সৈনিক ছিলেন। তবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে স্বপ্ন, সেটি যে তার মনের মধ্যে- সেই বোধশক্তির পথ থেকে লালন করতেন, এটি কিন্তু তার একটি লেখায় ফুটে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার চিন্তা-চেতনা যে তিনি ধারণ করতেন, একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে তার একটা দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ছিল। সেটি আমরা তার একটি লেখা থেকেই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি। কথাগুলো আমার নয়, কথাগুলো কারও মনগড়াও নয়, এই কথাগুলো আমরা তার নিজের লেখনী থেকে জানতে পারছি। আমরা স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শহীদ জিয়ার নিজের লেখা একটি প্রবন্ধ আছে, প্রবন্ধটির নাম ‘একটি জাতির জন্ম’। প্রবন্ধটি যথেষ্ট বড়। আমি খুব সংক্ষেপে সেই প্রবন্ধের দুই-একটি লাইন আপনাদের সামনে বলবো। যেখান থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে পুরো বিষয়টি।
তিনি বলেন, এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, স্বাধীন বাংলাদেশ, সার্বভৌম একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন বহুদিন যাবত শহীদ জিয়া মনে লালন করছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধটি দৈনিক বাংলা পত্রিকার প্রথম ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পরে, প্রথম যে আমরা স্বাধীনতা দিবস পালন করি, সেই দিবস উপলক্ষে যে প্রথম ক্রোড়পত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেই ক্রোড়পত্রে এই লেখাটি ছাপা হয়েছিল বা প্রবন্ধটি ছাপা হয়েছিল। প্রবন্ধটি ছিল এরকম, যেই লাইনটি আপনাদের সামনে আমি উল্লেখ করতে চাইছি, এই প্রবন্ধটি বা নিবন্ধটির শেষ প্যারায় শহীদ জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন, ‘তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট, ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সাল, রক্তের আঁখরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন, বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে, স্মরণ রাখবে ভালোবাসবে। এই দিনটি তারা কোনোদিন ভুলবে না, কোনোদিন না।’- এভাবেই উনি লিখেছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ রাত দুটো বেজে ১৫ মিনিটে কী হয়েছিল, আমি মনে করি স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন, এই তথ্যটি অবশ্যই তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে। কারণ শহীদ জিয়ার এই লেখা ১৯৭২ সালের প্রবন্ধটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, তখন কিন্তু মাত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তারা কিন্তু প্রত্যেকেই তখন বেঁচে ছিলেন- যারা বেঁচে ছিলেন যুদ্ধের শেষের পরে। এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পরে কারও পক্ষ থেকেই আমরা কোনোরকম আপত্তি বা এমন কিছু কথা পাইনি, যা এ প্রবন্ধ বা লেখাটিকে কন্ট্রাডিক্ট করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদ জিয়ার নিবন্ধনটি ১৯৭৪ সালে আবারো প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রা, বিচিত্রা নামে একটি ম্যাগাজিন ছিল সাপ্তাহিক, সেটিতে প্রকাশিত হয়েছিল- শহীদ জিয়ার প্রবন্ধটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অনন্য দলিল, ৭৪ সালেও আবার যখন প্রকাশিত হয়েছিল- কারোরই কোনো আপত্তি ছিল না। শহীদ জিয়া তার লেখায় যা যা বলেছিলেন অবিকল ছিল। সেই সময় সরকারে কারা ছিল, রাজনৈতিকভাবে কারা কোথায় অবস্থান করছিল, আমাদের কমবেশি প্রত্যেকেরই ধারণা আছে। কিন্তু সেই সময় তৎকালীন সরকার অথবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেউ শহীদ জিয়ার লেখা প্রবন্ধের কোনো বক্তব্যকে কেউ কোনোভাবেই খণ্ডন করার চেষ্টাও তারা করেননি। কারণ সেই সময় যারা ছিলেন, তারা জানতেন শহীদ জিয়ার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ প্রবন্ধে উল্লেখিত সত্য সেগুলো।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ ধরেও বিশ্বের যেখানে যারা স্বাধীনতার লড়াই করেছেন, সংগ্রাম করেছেন- একমাত্র তাদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব স্বাধীনতার মূল্য কতোখানি। আমরা যদি একটু পাশে তাকাই তাহলেই দেখতে পারবো স্বাধীনতার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারছে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনের মানুষ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা ১৯৭১ সালের আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে আমরা ২০২৪ সালে দেশ এবং স্বাধীনতা রক্ষা করেছি। প্রতিটি প্রাণের স্বপ্ন আছে, আকাক্সক্ষা আছে, স্বপ্ন ছিল, আকাক্সক্ষাও ছিল, সেই আকাক্সক্ষা পূরণেই যারা সেদিন লড়াই করেছিল- তারা সাহসের সঙ্গে অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করেছিলেন ৭১ ও ২৪ সালে।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামের সকল শহীদের আকাক্সক্ষা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ভিত্তিক তাঁবেদারমুক্ত একটি স্বাধীন-সার্বভৌম নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। আমাদের আকাক্সক্ষা সীমাহীন হলেও সম্পদের সীমাবদ্ধতা আমাদের রয়েছে। আমাদের স্বাদ এবং সাধ্যের মধ্যে ফারাক থাকলেও আমি এই দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই- আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে সকলে একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করি তাহলে অবশ্যই আমাদের কাক্সিক্ষত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো।
তিনি বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার আপনাদেরই সরকার, বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকার এদেশের মানুষের নির্বাচিত সরকার, বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকার এদেশের মানুষের প্রতিষ্ঠিত সরকার, সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে ফ্যামিলি কাডর্, কৃষক কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করছি, প্রতিনিয়ত তার জন্য আপনাদের এই সরকার অক্লান্ত পরিশ্রম করছে, চেষ্টা করে যাচ্ছে।
দেশবাসীর উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন আমাদের এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হোক- সমাজের একটি অংশ নয় বরং আমরা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে এই দেশে ভালো থাকবো- এটি হোক এই স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার। আসুন আমরা প্রত্যেকে একসঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে, প্রত্যেকে খারাপকে দূরে ঠেলে দিয়ে ভালোকে সঙ্গে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করি। এই হোক আমাদের আজকের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার, প্রত্যাশা, প্রতিজ্ঞা এবং শপথ।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য রাখেন।
এছাড়া সভায় আরও অংশ নেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।

আব্দুল জব্বার
৩ মাস আগেএকদিকে বলছেন এমন কিছু বলা ঠিক হবে না, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো করে অথচ আপনি নিজেই বঙ্গবন্ধু আর তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ওপর কোন আলোচনাই করছেন না - এটা কি দ্বিচারিতা নয়?