মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমেই জটিল আকার নিচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উত্তেজনা। যার প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক রাজনীতি ও
অর্থনীতিতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, একদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনাও সমান তালে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার বিষয়ে বেশ তৎপর। ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় সম্ভাব্য হামলার সময়সীমা তিনি আরও ১০ দিন পিছিয়ে দিয়েছেন। যা কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্দার আড়ালে এই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান, যা এই সংকট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও গত সপ্তাহেই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার কথা ছিল, বাস্তবে তা এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। তেহরান ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ১৫ দফা প্রস্তাবকে একপেশে হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা এই সংঘাতের স্থায়ী অবসান চায়। অন্যথায় যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার ঘোষণা দিয়ে তারা তাদের কৌশলগত অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইসরাইলের লাগাতার হামলা। ইরান ও লেবাননে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে দেশটি। যার জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তেল আবিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং বিশ্ব জুড়ে খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুতর সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ যদি অস্থিতিশীল থাকে, তাহলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
কুয়েত, রিয়াদ, আরব আমিরাত ও জর্ডানে ড্রোন হামলা: সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদ প্রদেশ লক্ষ্য করে ৬টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে রুখে দেয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি চারটি ক্ষেপণাস্ত্র পারস্য উপসাগরের পানি এবং জনশূন্য এলাকায় পড়েছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও জর্ডানে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া ৬টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৯টি ড্রোন মাঝপথে রুখে দিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত মোট ৩৭৮টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৮৩৫টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন আমিরাতি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ধ্বংস করেছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে জর্ডানের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে আসা দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। তৃতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি দেশের পূর্বাঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়েছে, যাতে কিছু বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
কুয়েতের গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার ভোরে মুবারক আল কাবীর বন্দরের অবকাঠামো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে কেবল বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতির কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় যোগ করেছে। শুক্রবার ভোরে তাদের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দরটিও একটি ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েত পোর্ট অথরিটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম এক্সে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভোরে ড্রোনের আঘাতে শুওয়াইখ বন্দরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বস্তুগত ক্ষতি হলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে হুতিদের জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা: ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় সংঘাতে তেহরানের পক্ষে ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দিন দিন বাড়ছে। গাজা সংঘাতের সময় হুতিরা লোহিত সাগরে বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালিয়ে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ইরান-ঘনিষ্ঠ এই বিদ্রোহীরা বর্তমান সংঘাত থেকে দূরে থাকলেও পর্যবেক্ষকরা মনে করেন হুতিরা যেকোনো সময় এই যুদ্ধে সক্রিয় হতে পারে।
হুতি প্রধান আবদেল-মালেক আল-হুতি এর আগেই জানিয়েছেন, তাদের হাত বন্দুকের ট্রিগারে রয়েছে এবং সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গত ২১শে মার্চ ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে একজন ইরানি সামরিক কর্মকর্তা জানান, খার্গ দ্বীপে ইরানের তেল স্থাপনায় যদি কোনো মার্কিন আগ্রাসন ঘটে, তবে তেহরান লোহিত সাগর এবং ইয়েমেনের পশ্চিমে অবস্থিত বাব- আল-মান্দেব প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরির পথ বেছে নেবে।
বিশ্লেষকরা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব-আল-মান্দেব অবরোধ করা হলে জ্বালানি বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। তবে ইয়েমেনের জন্য এর সামরিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ ও চড়া। ইয়েমেনি ‘আবাদ স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর প্রধান আব্দুস সালাম মোহাম্মদ আল জাজিরাকে বলেন, হুতিরা যদি ইরানের সমর্থনে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের মূল লক্ষ্য হবে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দরগুলোতে হামলা চালানো এবং বাব-আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া। যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে।
ইরানে হামলা জোরদারের হুঁশিয়ারি: ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শুক্রবার বলেছেন, ইরানের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর হামলা এখন থেকে আরও তীব্র এবং বিস্তৃত হবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে ইসরাইলের বেসামরিক জনগণের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ বন্ধ করার জন্য বারবার সতর্ক করেছিলেন। কাটজ বলেন, সতর্কবার্তা সত্ত্বেও হামলা অব্যাহত রয়েছেÑ আর তাই ইরানে হামলা আরও জোরদার করা হবে। যেসব লক্ষ্যবস্তু ও এলাকা এই শাসনগোষ্ঠীকে ইসরাইলি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তৈরি ও পরিচালনায় সহায়তা করছে, সেগুলোকে হামলার আওতায় আনা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধে ইরানে ৬০০-এর বেশি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং ১০০০-এর বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হতাহত হয়েছেন। শুক্রবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের এক জরুরি বিতর্কে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আরাগচি বলেন, আক্রমণকারীদের হামলার ধরন এবং তাদের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, তাদের লক্ষ্য আসলে গণহত্যা চালানো। এই জরুরি বিতর্কটি মূলত গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলার ওপর ভিত্তি করে আয়োজন করা হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ওই হামলায় ১৬৫ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের বেশির ভাগই শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী এই বিস্ফোরণটি সম্ভবত মার্কিন বিমান হামলার কারণে ঘটেছে।
