হত্যা মামলায় মামুন খালেদ রিমান্ডে

হত্যা মামলায় মামুন খালেদ রিমান্ডে

ফন্ট সাইজ:

এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) শেখ মামুন খালেদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা (ডিবি)। রাতভর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে রাখার পর মিরপুর মডেল থানার এক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ উভয়ের বক্তব্য শুনে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিদ্দিক আজাদের আদালত।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে আমরা ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দেলোয়ার হোসেন নামে এক আন্দোলনকারীকে হত্যার দায়ে তার নামে মিরপুর মডেল থানায় মামলা হয়। ২০২৫ সালের ৬ই জুলাই নিহত দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী লিজা বাদী হয়ে ওই মামলা দায়ের করেন। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা একটি মামলায় অভিযুক্ত এই শেখ মামুন খালেদ। দুদকসহ তার বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। মিরপুর মডেল থানার হত্যা মামলায় সংশ্লিষ্টতা থাকায় তাকে আদালতে সোপর্দ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার বিরুদ্ধে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি’র এসআই কফিল উদ্দিন এই রিমান্ডের আবেদন করেন।

এদিকে গতকাল আদালতের রিমান্ড আবেদনে ডিবি’র এসআই কফিল উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে দেলোয়ার হোসেন (৪০) জুলাই ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টিতে অবস্থান করছিলেন। ওই সময় এজাহারভুক্ত আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ৫০০ থেকে ৭০০ জন আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠনের সন্ত্রাসীরা মামুন খালেদের নির্দেশে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে দেলোয়ার হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে লুটিয়ে পড়েন। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১শে জুলাই দেলোয়ার মারা যান। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করে। এই মামলার ঘটনার সঙ্গে মামুন খালেদের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটনসহ সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মামুন খালেদকে নিবিড়ভাবে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ড দরকার। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী। অন্যদিকে আসামির পক্ষে রিমান্ড বাতিলের আবেদন জানিয়ে শুনানি করেন এডভোকেট নজরুল ইসলাম খান পাখি। উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের পর আদালত পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

উল্লেখ্য, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মামুন খালেদ সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের শেষ দিকে ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো-সিআইবি’র পরিচালক ছিলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি একই পদে ছিলেন। এরপর ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হন তিনি। ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের সময় ব্যাপক তৎপরতা ছিল এই মামুন খালেদের। ডিজিএফআই কর্মকর্তা হিসেবে তিনি উচ্ছেদের সার্বিক তদারকি করেন। বেগম খালেদা জিয়ার ৩৮ বছরের আবাসস্থল থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিহিংসার এক কালো অধ্যায়।

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর পৃথক দু’টি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২২শে মে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) শেখ মামুন খালেদ, তার স্ত্রী নিগার সুলতানা খালেদ, কর কমিশনার আবু সাঈদ মো. মুস্তাক এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল টি. এম. জোবায়েরের ভায়রা ভাই খন্দকার আবুল কাইয়ুমের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দেয় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। ‘আয়না ঘর’-এর প্রতিষ্ঠা, অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ডিজিএফআইকে সম্পৃক্ত করা এবং বিতর্কিত ‘জঙ্গি নাটক’ সাজানোর ঘটনাসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প থেকে খালেদ শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎসহ ব্যাপক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ আত্মসাৎ ও ভূমি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আদালতে যা বললেন মামুন খালেদ
এদিকে ১/১১ পরবর্তী সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জামিন হওয়ার বিষয়ে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিলেন বলে দাবি করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদ। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিমান্ড শুনানিকালে এই দাবি করেন মামুন খালেদ। তিনি বলেন, ‘এক-এগারোর সময় তখন আমি কুমিল্লায় ছিলাম।... মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক সাহেবের জামিনের সরাসরি ভূমিকা পালন করেছি।’

বেলা ৩টার দিকে মামুন খালেদকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিদ্দিক আজাদের আদালতে তোলা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক কফিল উদ্দিন তাঁর সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীনসহ অন্যরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পিপি ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে বলেন, ছাত্র আন্দোলনের সময় আসামি মামুন খালেদের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। সেখানে দেলোয়ার নামে একজন নিহত হন।

মামুন খালেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে পিপি আরও বলেন, তিনি এক-এগারোর সময়ের কুশীলবদের একজন। তখন তিনি ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন। সে সময় এ আসামি ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের বন্দী করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এবং হেনস্তা করেন। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে যাঁরা সহযোগিতার করছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনি একজন। যার পুরস্কারস্বরূপ তিনি ডিজিএফআইয়ের প্রধান হন। তারপর আয়নাঘর (গোপন বন্দিশালা) তৈরি করেন। সেখানে অত্যাচার, গানপাউডার দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারাসহ নানা অপরাধ করেন। পাশাপাশি ডিজিএফআইকে রাজনৈতিকীকরণের কুশীলব তিনি।

এ ছাড়া মামুন খালেদ জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অভিযোগ করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, সে কারণে ইতিমধ্যে আদালত তিনি ও তাঁর স্ত্রীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পিপি আরও বলেন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে এক কাপড়ে বের করে দেন এই মামুন খালেদ। সে কারণে শেখ হাসিনা তাঁকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেন। এসব বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে মামুন খালেদকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। বাদীপক্ষের আইনজীবীও আাদালতে শুনানিতে একই কথা বলেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে মোরশেদ হোসেন শাহীন ও নজরুল ইসলাম রিমান্ড আবেদন বাতিল করে মামুন খালেদের জামিন আবেদন করেন। আইনজীবী মোরশেদ হোসেন বলেন, এ মামলার এজাহারে মামুন খালেদের নাম নেই। বাদী সেখানে নির্দিষ্টভাবে আসামিদের নাম বলে দিয়েছেন। উচ্চ আদালতের আদেশে বলা আছে, যেকোনো মামলা হতে হলে নির্ভরযোগ্য চারটি কারণ থাকতে হবে, তার একটিও রাষ্ট্রপক্ষ দেখাতে পারেনি। তিনি ওই সময় একজন চাকরিজীবী ছাড়া আর কিছু ছিলেন না।

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী নজরুল ইসলাম আদালতে বলেন, আসামি মামুন খালেদ ২০১৬ সালে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষ করেছেন। তিন যুগের বেশি সময় তিনি পাঁচটি পদে চাকরি করেছেন। একটি পদেও আইনবহির্ভূতভাবে সুবিধা নেননি। আয়নাঘরের দায়িত্বে তিনি ছিলেন না। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের বহু আগে তিনি অবসরে গেছেন।

তা ছাড়া খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদের সময় মামুন খালেদ তাঁর নিজের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বলে দাবি করেন তাঁর এই আইনজীবী। মামলায় মামুন খালেদের বয়স ৬৩ বছর দেখানো হলেও তাঁর বয়স আরও বেশি দাবি করে এই আইনজীবী বলেন, সে কারণে তাঁকে রিমান্ডে দেওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজনে জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হোক। এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলেন আসামি মামুন খালেদ। সালাম দিয়ে তিনি বলেন, ‘এক-এগারোর সময় তখন আমি কুমিল্লায়। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক সাহেবের জামিনে সরাসরি ভূমিকা পালন করেছি।’ অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি আদালতে আরও বলেন, ‘জলসিঁড়ি প্রকল্পের টাকার যে অভিযোগ, সেটি হচ্ছে- নজরুল সাহেব নামে একজনের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব আমাকে দেন। আমি শুধু উদ্ধারের কাজে ছিলাম।’

আয়নাঘরের বিষয়ে ইতিমধ্যে দুইতিনবার কথা বলেছেন উল্লেখ করে আদালতে মামুন খালেদ বলেন, ‘আমার সময়কালে (গুমের) কোনো অভিযোগ নেই।’ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিউইপি) প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ছিলেন উল্লেখ করে মামুন খালেদ আরও বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় সেখানকার শিক্ষার্থীরা উৎসাহিত হয়। এমনকি এ মামলার অভিযোগে যে জায়গার কথা বলা হয়েছে, ওখানে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। কারণ, ডিওএইচএসের বাইরে যাই নাই। ২৪ সালে আমার কথামতো কে গুলি করবে? তখন আমি সিভিলিয়ান।’ শুনানি শেষে আদালত মামুন খালেদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

Salah Uddin

৩ মাস আগে

এই লোক গুলো সবাই কার্লপিট এরা দেশের উপরের টাও খাই আবার নিচের টাও কুড়িয়ে নেয়, এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যেনো অন্য অফিসার রা শিক্ষা পায়,

BB

৩ মাস আগে

এরে নিয়ম করে দিনে তিন বার রাজহাঁসের ডিম থেরাপি দেয়া হোক।

BAD MOUTH

৩ মাস আগে

মিথ্যা ও অন্যায়ের প্রতিশোধ মিথ্যা ও অন্যায় দিয়ে।

BAD MOUTH

৩ মাস আগে

মিথ্যা ও অন্যায়ের প্রতিশোধ মিথ্যা ও অন্যায় দিয়ে।

মন্তব্য করুন